‘রেলসেবা’ অ্যাপে টিকিট কিনলেন যাত্রী, অ্যাপ না চিনে যাত্রীকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিলেন টিটি

স্টাফ রিপোর্টার: ট্রেনের গায়ে সাঁটানো প্রজ্ঞাপন (বায়ে) এবং অ্যাপে লগিন পূর্ব ও পরবর্তী ইন্টারফেস। ছবি: যুগান্তর
অবাক হলেও সত্য, বাংলাদেশ রেলওয়ের সদ্য উন্মোচন করা ‘রেলসেবা’ অ্যাপ সম্পর্কে ন্যূনতম ধারনা নেই টিটি তথা টিকিট চেকারদের। অ্যাপে স্পষ্ট করে ‘টিকিট প্রিন্ট করতে হবে না’ উল্লেখ থাকলেও শুধু চেকারদের অজ্ঞতার কারণে ট্রেন থেকে অ্যাপের যাত্রী নামিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে!

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক নারী যুগান্তরের কাছে এমন একটি অভিযোগ করেছেন। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার অফিস শেষ করে রাতের ট্রেনে স্বামীসহ রাজশাহী যাওয়ার জন্য ‘রেলসেবা’ অ্যাপ দিয়ে দুটি টিকেট ক্রয় করেন তিনি।
পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে তাদের সিট মিলে যায়। অফিস থেকে বের হওয়ার আগে তিনি টিকেটের গায়ে লেখা পুরো শর্তগুলো পড়ে দেখেন। সেখানে লেখা আচ্ছে, নিজের জন্য অ্যাপ দিয়ে টিকিট ক্রয় করলে সেটা প্রিন্ট করতে হবে না এবং সঙ্গে ফটো আইডি থাকতে হবে। তবে অন্যের জন্য অ্যাপ দিয়ে টিকিট কাটা হলে সে ক্ষেত্রে টিকিট প্রিন্ট করার কথা উল্লেখ রয়েছে।

শর্তে এভাবে লেখা আছে, If you purchased e-ticket for your own travel, print copy of email is sufficient to travel. You don’t need to print out any hard copy of ticket from station. But please make sure to bring along valid photo identity. If you purchase e-ticket for other persons, you have to print out hard copy of e-ticket from designated counters of any online stations. Hope you have a pleasant and safe journey with Bangladesh Railway.
ওই নারী যাত্রী অভিযোগ করে বলেন, রাত ১১টা ১০ মিনিটে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠার পর তাদের টিকিট চেক করা হয় টাঙ্গাইল স্টেশনের একটু আগে। ৪/৫ জন চেকার দলবেঁধে এসে তাদের প্রিন্ট কপি টিকিট না থাকা ও পুনরায় টিকিটের টাকা পরিশোধ না করার অভিযোগে টাঙ্গাইল স্টেশনে যাত্রীদের নামিয়ে দেন।

চেকাররা তাদের মোবাইলে তোলা একটি ছবি দেখিয়ে বলেন, ট্রেনের গায়ে প্রজ্ঞাপনে লেখা আছে, ‘যে কোন অনলাইন স্টেশন থেকে সংগৃহীত টিকিট মোবাইল ফোনের অ্যাপসে সফটকপি/ছবি প্রদর্শন করা যাবে না’। চেকারদের দাবি, অ্যাপস ও ই-টিকিট নিয়ে এটাই রেলওয়ের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন। যা তিন বছর আগে ট্রেনের বিভিন্ন দেওয়ালে সাঁটানো আছে।

চেকারদের দাবি, অ্যাপস ও ই-টিকিট নিয়ে এটাই রেলওয়ের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন। যা তিন বছর আগে ট্রেনের বিভিন্ন দেওয়ালে সাঁটানো আছে।
যাত্রীরা চেকারদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, ২৮ এপ্রিল ২০১৯ রেলমন্ত্রী নতুন ‘রেলসেবা’ অ্যাপ উদ্বোধন করেছেন এবং ই-মেইলে পাঠানো টিকিটে স্পষ্ট লেখা আছে টিকিট নিজের হলে তা প্রিন্ট করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু চেকাররা বলছেন, আমাদের কাছে যে নির্দেশনা দেয়া আছে এর বাইরে কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়। টিকিটের টাকা দিতে হবে না হলে নেমে যেতে হবে। যাত্রীরা পুনরায় টাকা দিতে রাজি না হলে তাদের ট্রেন থেকে লাগেজসহ নামিয়ে দিতে বাধ্য করেন। পরে তারা টাঙ্গাইল থেকে সকালের বাসে রাজশাহীতে পৌঁছান বলে যুগান্তরকে জানান।
শুধু টিকিট প্রিন্ট নিয়েই ভোগান্তি নয়; রেলসেবা অ্যাপ নিয়ে আরও নানান বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। অনলাইনে রেভিনিউ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান অ্যাডল কমিউনিকেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রদ্যোত বরণ চৌধুরী বলছিলেন, তিনি অ্যাপটি প্লে-স্টোর থেকে নামিয়ে প্রথম কয়েকদিন চালুই করতে পারেননি।

অ্যাপটিতে রেজিস্ট্রেশন করতে গেলে বলা হচ্ছিল, ‘ই-সেবা থেকে পিএনআর আপডেট করুন’। তার প্রশ্ন, আমি অ্যাপে রেজিস্ট্রেশন করতে গেলে অন্য সাইটে গিয়ে আবার তথ্য আপডেট করতে হবে কেন? তিনি আরও বলেন, কয়েকদিন লাগাতার চেস্টা করার পর এমনিতেই রেজিস্ট্রেশন হয়েছে।
এদিকে অ্যাপে রেল টিকিট কাটার বিরল অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক সাংবাদিকের। তিনি বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৫২ মিনিটে ‘রেলসেবা অ্যাপস’র মাধ্যমে শনিবারের সুবর্ণ এক্সপ্রেসের দুটি শোভন চেয়ারের টিকিট কাটেন। সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যাংক একাউন্ট থেকে একটি পূর্ণ এবং একটি হাফ টিকিটের মূল্য বাবদ ৬৭৫ টাকা কেটে নেওয়া হয়।

টিকিট কেনা নিশ্চিত করে রেলের ই-মেইল রাত ১০টায় না আসার পর চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের সিএনএস বিভাগে ওই সাংবাদিক যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়, টিকিট নিশ্চিত হয়নি এবং কেটে ফেলা টাকা আট কর্মদিবসের মধ্যে ফেরত দেওয়া হবে।
কিন্তু শনিবার বেলা ১২টা ৩১ মিনিটে তার ই-মেইলে সুবর্ণ এক্সপ্রেসের টিকিট দুটি কাটার নিশ্চিতকরণ তথ্য আসে। এতে বগি নম্বর- ‘ন’ এবং সিট নম্বর- ৩৫ ও ৩৬ উল্লেখ করা হয়। ওই ই-মেইলের মাধ্যমে গ্রাহককে সংশ্লিষ্ট স্টেশন থেকে টিকিট দুটি সংগ্রহ করতে বলা হয়।
চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের বিরতিহীন ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেস সকাল ৭টায় চট্টগ্রামে রেল স্টেশন ছেড়ে যায়, ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে পৌছায় দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে। খবর নিয়ে জানা যায়, শনিবার ট্রেনটি ঢাকায় পৌঁছেছে ১২টা ২২ মিনিটে। অর্থাৎ টিকেট নিশ্চিত করে ই-মেইল যখন এসেছে, ততক্ষণে সুবর্ণ এক্সপ্রেস ঢাকায় গন্তব্যের প্রায় কাছাকাছি।

আর ই-মেইলে দেখা যায়, ট্রেনটি ছেড়ে যাওয়ার পর টিকিট ইস্যু করা হয়েছে। টিকেট ইস্যুর সময় লেখা আছে ১১ মে বেলা ১১টা ৫৪ মিনিট, অথচ টিকেট সংগ্রহের শেষ সময় বলা হয়েছে ১১ মে সকাল ৬ টা ৪৫ মিনিট।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে রেলের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার মুরাদ হোসেন বলেন, আমরা কয়েকদিন আগেই অ্যাপটি চালু করেছি। নতুন অ্যাপ বলে আমরা বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। আশা করছি শিগগির সমস্যাগুলোর সমাধান হবে।
এদিকে গুগল প্লে-স্টোরে গিয়ে দেখা গেছে, অ্যাপটি সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষের অভিযোগ রয়েছে। ঠিক মত কাজ না করা, টিকিট না দিয়েই টাকা কেটে নেয়া, অ্যাপে লগিন না হওয়াসহ নানান বিষয়ে লিখিত অভিযোগ রয়েছে অ্যাপটির বিরুদ্ধে। নেতিবাচক রিভিউ দেয়ার কারণে অ্যাপটির বর্তমান রেটিং ৫ এর মধ্যে ৩।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ এপ্রিল ‘রেলসেবা’ মোবাইল অ্যাপ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ৫০ শতাংশ টিকিট বিক্রি হবে অ্যাপের মাধ্যমে। টিকিটের দাম পরিশোধ করা যাবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও। গুগল প্লে-স্টোর গিয়ে অ্যাপটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে https://play.google.com/store/apps/details?id=com.cnsbd.railsheba এই ঠিকানা থেকে। সূত্র যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *