Breaking News
Home | অনুসন্ধান | অসহায় রোগীদের পাশে কয়েকজন ‘দুঃখী’

অসহায় রোগীদের পাশে কয়েকজন ‘দুঃখী’

তিন মাস আগে সড়ক দুর্ঘটনায় ডান পা ভেঙে যায় কিশোর মো. খোকনের। তার মা নেই। বাবা আরেকটি বিয়ে করে তাকে ফেলে চলে গেছে। সে থাকে নানির বাড়িতে। অভাবের সংসারে তার ঠিকমতো চিকিৎসা হচ্ছিল না। ধীরে ধীরে খোকনের পায়ের ক্ষতস্থানে পচন ধরতে শুরু করে।

পাড়ার এক লোক একদিন খোকনের নানিকে ‘দুঃখী’ ফারুকের (মো. ফারুক হোসাইন) সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে ফেসবুকভিত্তিক একটি সংগঠন করেছেন ফারুক। নাম ‘মানব কল্যাণে এসো কিছু করি’। ফারুক একদিন হাজির হন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মুনিয়াপুকুর এলাকার খোকনের নানির বাড়িতে। কিশোরের অবস্থা দেখে তাকে নিয়ে যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসা শেষে অনেকটা সুস্থ হয়ে ১৩ সেপ্টেম্বর বাড়ি ফিরেছে সে।

পা ভেঙে ফেলা খোকন বলে, ‘কোনো দিন ভালো হব ভাবিনি। ভাইয়া (ফারুক) এসে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করল। এখন অনেক সুস্থ আছি।’

ফেসবুকভিত্তিক ওই সংগঠনটি গত ১৪ মাসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ২০০ অসহায় নারী-পুরুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সংগঠনের খরচে চলেছে এসব অসহায় মানুষের চিকিৎসা।

হাসপাতালে ভর্তি থেকে শুরু করে ওষুধ কিনে দেওয়া, রক্ত জোগাড় করা—সবই করেছেন সংগঠনের সদস্যরা। চিকিৎসা-সহায়তার পাশাপাশি হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজানের ২০ জন গরিব শিক্ষার্থীর লেখাপড়ারও দায়িত্ব নিয়েছে তারা। এ ছাড়া অসহায় দুই ব্যক্তিকে দুটি পানের দোকান করে দিয়েছে। চার নারীকে চারটি সেলাই মেশিন কিনে দিয়ে আয়ের পথ দেখিয়েছে। দরিদ্র পরিবারের তিন মেয়ের বিয়ের যাবতীয় খরচ দিয়েছে। এ ছাড়া দরিদ্র পরিবারের ১০০ মেয়ের বিয়েতে আর্থিক সহায়তা করেছে।

ফেসবুকভিত্তিক সংগঠনটির প্রধান উদ্যোক্তা ফারুক হোসাইন। ২০১৬ সালের ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রথমে নিজের বন্ধুদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। অল্প কয়েকজনই সহায়তার হাত বাড়ান। সামান্য কিছু টাকা পাওয়া যায়। তা দিয়েই অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়ান ফারুক। ফারুকের এই উদ্যোগ এলাকার লোকজনের কাছে প্রথমে ছিল ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর’ মতো কিছু একটা! পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধুরা তাঁর নাম দেন ‘দুঃখী’ ফারুক। এভাবে কিছুদিন চলার পর ফেসবুকভিত্তিক একটি সংগঠনই গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এখন এই সংগঠনের সদস্যরাও ‘দুঃখী’ নামে পরিচিত।

গত ১৪ মাসে এই সংগঠন প্রায় ৬০ লাখ টাকা অসহায় মানুষের চিকিৎসা, শিক্ষা, ত্রাণ ইত্যাদি খাতে ব্যয় করেছে। সংগঠনের নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। এখন ৫ লাখ টাকা তাদের ব্যাংক হিসাবে জমা রয়েছে। এই মুহূর্তে ১৪ জনের চিকিৎসার খরচ বহন করছে সংগঠনটি। গত এক বছরে প্রায় ৫ হাজার মানুষের কাছ থেকে তারা টাকা সংগ্রহ করেছে। সংগঠনের সদস্য এক হাজার ১৫০ জন। সক্রিয় সদস্য ২০ জনের মতো।

পেছনের কথা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় ক্লাসে বরাবরই প্রথম ছিলেন ফারুক হোসাইন। তাঁর সবজিবিক্রেতা বাবার পক্ষে সংসারের খরচ চালানো সম্ভব ছিল না। তাই কিশোর বয়সে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় ফারুক সিদ্ধান্ত নেন লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে ফেলবেন। এভাবে আর না! সংসারের আয় বাড়াতে প্রথমে বাসচালকের সহযোগীর কাজ নেন। কিছুদিন রিকশাও চালিয়েছেন। নিজে লেখাপড়া ছেড়ে দিলেও ছোট চার ভাইবোনকে যাতে একই ভাগ্য বরণ করতে না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে বাড়তি খাটতে হয়েছে তাঁকে। পরিশ্রম ও উদ্যোগী মানসিকতার স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। সচ্ছল এই মানুষটির এখন তিনটি কাপড়ের দোকান রয়েছে।

চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ফরহাদাবাদের বাসিন্দা ফারুক বলেন, ক্ষুধার কষ্ট কী তা বোঝেন তিনি। একটা ছেলের কেন লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়, তা-ও জানেন তিনি। সে কারণে একটা প্রতিজ্ঞা করেন অন্তত পরিচিত কেউ যাতে টাকার অভাবে লেখাপড়া ছেড়ে না দেয়। এই কষ্ট থেকেই সংগঠন করার চিন্তা মাথায় আসে তাঁর। তবে সে সংগঠনের সদস্যরা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে জমিয়ে আড্ডা দেবে না। তারা যে যেখানেই থাকুক অসহায় মানুষের ডাকে সাড়া দেবে।

২০১৬ সালের ২৬ জুলাই প্রতিদিনের মতো নিজের দোকানে বসে ছিলেন ফারুক। সাদাসিধা পোশাক পরা এক বৃদ্ধ দোকানে ঢুকে অনুনয়-বিনয় করে বলতে থাকেন, তিনি ভিক্ষুক নন। ইনজেকশন দেওয়ার জন্য ৫০০ টাকা দরকার। বৃদ্ধকে টাকা দিয়ে বিদায় করলেও তাঁর অসহায় মুখটি কিছুতেই মন থেকে মুছতে পারছিলেন না। পরে নিজের ফেসবুক পাতায় একটি স্ট্যাটাস দিলেন তিনি। সেটি ছিল এ রকম, ‘মাত্র ১০০ টাকা দিয়ে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। আসুন না জনকল্যাণমূলক কিছু কাজ করি আমরা।’

ফারুক হোসাইন বলেন, অসহায় মানুষের দুর্দশা নিয়ে তিনি ফেসবুকে নিয়মিত স্ট্যাটাস দিতে থাকেন। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পারা কোনো রোগী কিংবা শিক্ষার্থীর বিবরণ (ওই ব্যক্তির ছবি, ভিডিওসহ) ফেসবুকে তুলে ধরেন। কে কত টাকা দিল, কোন খাতে কত খরচ হলো—সব হিসাব (ভাউচারসহ) নিয়মিত ফেসবুকেই তা জানিয়ে দেন। ভবিষ্যতে একটি হাসপাতাল গড়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি।

রোগীর পাশে

২০১৬ সালের জুলাই মাসে ফটিকছড়ির ক্যানসার আক্রান্ত কলেজছাত্র আবদুল হান্নানের হাতে ৩০ হাজার টাকা তুলে দেয় ফারুকের সংগঠন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হান্নান মারা যায়। এখন ১৪ জন রোগীকে সম্পূর্ণ সংগঠনের খরচে চিকিৎসা করাচ্ছেন। তাঁদের একজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিডনি রোগী ফজল করিম (৬০)। গত মঙ্গলবার ফজল করিমকে হাসপাতালে দেখতে যান ফারুক ও তাঁর সংগঠনের আরেক সদস্য মো. কামাল। পেশায় বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি ফজল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই লোকগুলো না হলে আমার চিকিৎসা হতো না।’

ফজল করিমের মেয়ে রুমী আক্তার বলেন, ‘ওষুধ থেকে শুরু করে সব খরচ ভাইয়ারা (ফারুকেরা) দিচ্ছেন। এখন আব্বা আগের চেয়ে সুস্থ। অন্তত ১০ হাজার টাকার ওপরে খরচ দিয়েছেন তাঁরা।’

গত ফেব্রুয়ারিতে ফটিকছড়ির ভুজপুরে এক বছর বয়সী মাইশার দুই হাত গরম পানিতে ঝলসে যায়। দুই হাতের কয়েকটি আঙুলও গরম পানিতে ঝরে যায়। পরে মো. ফারুক কয়েকজনকে নিয়ে উদ্যোগী হয়ে মেয়েটিকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান। মাইশা এখন অনেক সুস্থ।

কন্যাদায়গ্রস্ত বাবার পাশে

নিজেদের সম্পূর্ণ খরচে সংগঠনটি তিন তরুণীর বিয়ে দিয়েছে। তাঁরা হলেন ফরহাদাবাদের হোসনে আরা বেগম, ভুজপুরের আঁখি আক্তার ও ফটিকছড়ির ইয়াসমিন আক্তার।

ইয়াসমিনের চাচা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই সংগঠন এগিয়ে না এলে ভাতিজির বিয়ে দিতে পারতাম না।

সংগঠনের সদস্য ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘তিনজনের বিয়ের সম্পূর্ণ খরচের পাশাপাশি অন্তত ১০০ জন দরিদ্র মেয়ের বিয়েতে আর্থিক সাহায্য দিয়েছি আমরা। আমাদের ভালো কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছেন দুঃখী ফারুক।’

শিক্ষার্থীদের পাশে

চট্টগ্রামের নাজিরহাট আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের ১৩ জন, ফরহাদাবাদ উচ্চবিদ্যালয়ের ১১ জন, রাউজান উত্তর সর্তা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের ১১ জন, নাজিরহাট কলেজের ৫ জন, হাটহাজারী কলেজের ১ জন এবং কাটিরহাট মহিলা কলেজের ১ জন শিক্ষার্থীর বইপত্র, খাতা-কলম, শিক্ষক থেকে যাবতীয় খরচ সংগঠনটি বহন করছে। এ ছাড়া দুজন মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর খরচও দিচ্ছে।

নাজিরহাট কলেজের ছাত্রী রনি আক্তার বলে, পড়ালেখার খরচ জোগানোর সামর্থ্য তার পরিবারের নেই। এই সংগঠনটি এগিয়ে না এলে তার কলেজে পড়া হতো না।

এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি বন্যার্তদের ত্রাণ বিতরণও করে সংগঠনটি। গত বন্যায় গাইবান্ধায় ৫০০ পরিবারকে চাল-ডালসহ বিভিন্ন খাবার ত্রাণ হিসেবে দিয়েছে। এ ছাড়া নতুন আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে এ পর্যন্ত ২১ টন খাবার বিতরণ করে সংগঠনটি। সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমে মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন নিয়মিত সাহায্য করে।

এই সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আক্তার উননেছা প্রথম আলোকে বলেন, সংগঠনটি ভালো কাজ করে। এ ধরনের কাজ অন্যদের উৎসাহী করবে।

About admin

Check Also

নিজ হাতে গড়া হাজতের প্রথম বন্দি তিনি!

থানার জন্য নিজ জমির ওপর নির্মিত ভবন ভাড়া দেন আবদুর রশিদ। নিজ হাতেই ভবনের সব কাজ করেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাকেই প্রথম আসামি হয়ে ওই হাজতখানায় বন্দি হতে হলো। এ ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর পূবাইলে। আবদুর রশিদের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে। গাজীপুর মেট্রোপলিটনের (জিএমপি) আওতাভুক্ত আটটি থানার একটি পূবাইল থানা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিডিও কনফারেন্সে মাধ্যমে সদ্য উদ্বোধন ক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *