Breaking News
Home | বিশেষ প্রতিবেদন | ‘কখনো চাকরির জন্য চেষ্টা করিনি’

‘কখনো চাকরির জন্য চেষ্টা করিনি’

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বামনপাড়া গ্রামের পাকা সড়কটি থেকে একটি কাঁচা রাস্তা নেমে গেছে রেললাইনের দিকে। সেই রাস্তা ধরে কাদা মাড়িয়ে প্রায় এক কিলোমিটার যাওয়ার পর শাহীনুর রহমানদের বাড়ি। দূর থেকেই শোনা গেল মুরগির ডাক। ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, দুটি খামারে শত শত মুরগি। পাশেই গোয়ালঘরে নয়টি গাভি। আঙিনায় ঘুরে বেড়াচ্ছে টার্কি।

পুরো বাড়িটিই একটি খামার। খামারের নাম শাহীন পোলট্রি হ্যাচারি। সমন্বিত এ খামারে এখন সপ্তাহে ২০ হাজার মুরগির বাচ্চা উৎপাদিত হয়। ডিম, মুরগি, মুরগির বাচ্চা, দুধ বিক্রি করে মাসে সব খরচ বাদে মুনাফা হয় এক লাখ টাকার বেশি।

এ আয় শাহীনুর রহমানকে সমৃদ্ধ খামারিতে পরিণত করেছে। বাড়িতে টিনের ঘরের জায়গায় এখন তাঁর দুই ইউনিটের দোতলা পাকা ভবন। খামারের জমির পরিমাণ প্রায় চার গুণ হয়েছে। বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক কোটি টাকায়। পরিবারের সব সদস্যের সঙ্গে প্রতিদিন সাত-আটজন শ্রমিক কাজ করেন তাঁর খামারে। কৃষিতে অবদানের জন্য চলতি বছর শাহীনুর পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক।

খামারের পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও চালিয়েছেন শাহীন। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে ২০১৫ সালে মাস্টার্স পাস করেছেন। শাহীন বলেন, ‘আমি কখনো কোনো চাকরির জন্য চেষ্টা করিনি। গ্রামের অনেক তরুণকে খামার করার উৎসাহ দিয়েছি। অনেকে পড়াশোনা শেষ করে খামার করছে।’

আমরা যখন শাহীনের খামারে, তখন পাশের কলেজপাড়া থেকে দুই বন্ধু শাহীনের খামারে গিয়েছেন টার্কি পালনের পদ্ধতি দেখতে। তাঁদের একজন মমিনুল ইসলাম ঈশ্বরদী অ্যাগ্রিকালচারাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা কোর্স করে দুই হাজার মুরগির খামার করেছেন। মমিনুল বলেন, তিনিও চাকরি করতে যাননি।

শাহীনের এই খামারের শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালে শাহীনুর রহমানের বাবার হাতে। বাবা মোহাম্মদ আলী অসুস্থতার কারণে ঢাকার পোশাক কারখানার চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে যান। সেখানে ৪০টি মুরগি দিয়ে খামার শুরু করেন। তখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র শাহীনের কাজ ছিল হাতে দুটি মুরগি নিয়ে রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে বিক্রি করা। শাহীনের ভাষায়, কাজটি সহজ ছিল না। কারণ, তখন ভেড়ামারায় মানুষ লেয়ার, ব্রয়লার মুরগি চিনত না এবং গন্ধ বলে সেগুলো খেতে চাইত না। ধীরে ধীরে তা মানুষ খেতে শুরু করে, শাহীনদের খামারে মুরগির চাহিদা বাড়তে থাকে।

শাহীন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে ২০১৫ সালে মাস্টার্স পাস করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো কোনো চাকরির জন্য চেষ্টা করিনি। গ্রামের অনেক তরুণকে খামার করার উৎসাহ দিয়েছি। অনেকে পড়াশোনা শেষ করে খামার করছে।’
২০০২ সালে শাহীন ও তাঁর বাবা মুরগির খাবারের ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই এ ব্যবসায় প্রতিযোগিতা অনেক বেড়ে যাওয়ায় তা ছেড়ে দেন তাঁরা। ২০০৬ সালে শাহীন ও তাঁর বাবা বামনপাড়ায় হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু তখন তাঁদের ডিম ফোটানোর ইনকিউবেটর ছিল না। এ জন্য খামারের ডিম নিয়ে যশোর ও গোয়ালন্দ থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে এনে বিক্রি করতেন তাঁরা। কয়েক বছর পর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে একটি ইনকিউবেটর পান শাহীন। এ ছাড়া তিনি নিজেও পুরোনো একটি ইনকিউবেটর কিনে বাচ্চা উৎপাদন শুরু করেন।

এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। শাহীনের মুরগির খামার বড় হয়েছে, বাচ্চা বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে, আয় বেড়েছে। এখন নতুন নতুন বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছেন তিনি। খামারে নতুন যোগ হয়েছে টার্কি। টার্কির ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা বিক্রি শুরু করেছেন তিনি।

২০ সেপ্টেম্বর আমরা গিয়েছিলাম শাহীনের খামারে। বাড়ির সীমানায় ঢোকার আগেই শাহীন আমাদের জুতায় ওষুধ ছিটিয়ে দিলেন। মুরগির খামারে যে বাইরে থেকে রোগ আসতে পারে, তা জানা তাঁর। বাড়ির নিচতলায় শাহীনের কার্যালয়ে নানা পুরস্কারের ছবি। সবচেয়ে বড় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে নেওয়া জাতীয় কৃষি পদকের ছবিটি। শাহীন বললেন, খামারে তাঁর যে ইনকিউবেটরগুলো আছে, সেগুলো বড় খামারে কারিগরি কর্মকর্তাদের দিয়ে চালানো হয়। তাঁদের মাসে কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়। কিন্তু নিজের খামারে এসব কাজ তিনি নিজেই করেন। মুরগির রোগ সম্পর্কেও ভালো ধারণা হয়েছে তাঁর।

শাহীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং সেগুলো খুব ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছেন। ফলে একাধারে তিনি খামারের শ্রমিক, কারিগরি কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও বিপণনকর্মী।

শাহীনের খামারটি এখন বড় হয়েছে। ফলে ধাক্কা এলে তা সহ্য করার ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। যেমন এখন একটি সোনালিকা মুরগির বাচ্চার উৎপাদন খরচ ১৫ টাকা হলেও তা বিক্রি হচ্ছে ৮ টাকায়। কিন্তু লোকসান দিয়েও উৎপাদন চালাতে অসুবিধা হচ্ছে না। ২০০৭ সালে তাঁর খামারে বার্ড ফ্লুতে আড়াই হাজার ‘প্যারেন্ট স্টক’ বা বাচ্চা ফোটানোর জন্য ডিম পাড়ার মুরগি মারা যায়। এতে ক্ষতি হয় ১৮ লাখ টাকার। কিন্তু সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠেছেন তিনি।

শাহীনুর রহমানের এখন ইচ্ছা একটি আধুনিক ‘কনট্রোলড শেড’ খামার করা। এ জন্য তিনি সমমূলধন তহবিল বা ইক্যুইটি এন্টারপ্রেনারশিপ ফান্ড (ইইএফ) থেকে ঋণ নিতে চান। কৃষি ব্যাংক থেকে তাঁকে এখন ১৩ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। অন্যান্য ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে চাইলে তাঁর আগ্রহ ইইফ থেকে ঋণ নিতে। তিনি বলেন, সাধারণ খোলা খামারে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি অনেক বেশি। উৎসঃ প্রথম আলো

About admin

Check Also

জিয়া হত্যাকাণ্ড: যে রহস্যের জট খোলেনি

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার পর এর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *