Home | জাতীয় | এশিয়ার চালের বাজারে প্রধান ক্রেতা এখন বাংলাদেশ

এশিয়ার চালের বাজারে প্রধান ক্রেতা এখন বাংলাদেশ

হঠাৎ করেই এশিয়ার চালের বাজারের প্রধান ক্রেতা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। দুই দফা বন্যা ও সরকারি মজুদে ঘাটতি দেখা দেয়ায় প্রচুর পরিমাণ চাল আমদানি করতে হচ্ছে দেশে। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের মূল্য নির্ধারণেও অন্যতম নিয়ামক এখন ঢাকা।

কম্বোডিয়া থেকে ১০ লাখ টন চাল আমদানির চুক্তি সদ্যই চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ। আগামী পাঁচ বছর দেশটি থেকে এ চাল আমদানি করবে বাংলাদেশ। আমদানি চালের প্রথম চালানটির জাহাজীকরণ হবে চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে।

কম্বোডিয়ার সংবাদ মাধ্যম নমপেন পোস্টকে দেশটির রাইস ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুন লাক বলেছেন, আমরা এরই মধ্যে মূল্য-সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে সই করেছি, যার আওতায় ছয় মাসের মধ্যে আড়াই লাখ টন চাল রফতানির কথা বলা আছে। নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর এসব চালান পাঠানো হবে। রফতানি কার্যক্রমের সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকবে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি গ্রিন ট্রেড।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটি প্রতি বছর চাল রফতানি করে সাড়ে পাঁচ লাখ টনের মতো। সম্প্রতি স্বাক্ষরিত চুক্তির ফলে বাংলাদেশই এখন কম্বোডিয়ার চালের প্রধান ক্রেতা। কম্বোডিয়ার আরেক ক্রেতা চীন।

শুধু কম্বোডিয়া নয়, বাংলাদেশ চাল কিনছে ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার থেকেও। ভারতীয় চালের প্রধান ক্রেতা আফ্রিকার দেশগুলো হলেও এ বছর তাদের চাহিদা সেভাবে নেই। ফলে দেশটিতে চালের দাম বেশ খানিকটা কমেছে। এ অবস্থায় ক্রেতা হিসেবে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছেন দেশটির ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশের আমদানি চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে চালের দাম আবার বাড়তে পারে বলেও মনে করছেন তারা।

অন্ধ্র প্রদেশের কাকিনাড়াভিত্তিক এক চাল রফতানিকারক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, আফ্রিকার দেশগুলোয় এখন চালের আমদানি চাহিদা অনেক কম। এতে পণ্যটির দাম কিছুটা কমেছে। ডলারের বিপরীতে রুপির অবমূল্যায়নও এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে নিয়মিত চাল আমদানি করেন রাজীব দত্ত। গতকাল বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ভারত থেকে এখন শুধু বাংলাদেশই চাল আমদানি করছে। অন্য কোনো দেশ আপাতত আমদানি করছে না। এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় ভারতের বাজারে চালের দাম কমতে শুরু করেছে। টনপ্রতি ২০-৩০ ডলার কমে দেশটি থেকে চাল আমদানি করা যাচ্ছে।

ব্যাপক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে পাঁচ লাখ টন চাল রফতানির আশা করছে পণ্যটির শীর্ষ রফতানিকারক দেশ থাইল্যান্ড। বাংলাদেশের চাহিদার কথা উল্লেখ করে ব্যাংককের এক চাল ব্যবসায়ী রয়টার্সকে বলেন, আমরা আশা করছি, বন্যাসৃষ্ট সংকটের কারণে বাংলাদেশ আমাদের কাছ থেকে মোট পাঁচ লাখ টন চাল আমদানি করবে। এরই মধ্যে আড়াই লাখ টন আমদানি করেছে দেশটি।

বাংলাদেশ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে চালের চাহিদা সেভাবে না থাকায় থাইল্যান্ডেও পণ্যটির দাম কমছে। দেশটির ৫ শতাংশ ভাঙা চাল এখন বিক্রি হচ্ছে প্রতি টন ৩৭৫-৩৮৫ ডলারে (ফ্রি অন বোর্ড)। যেখানে গত সপ্তাহেও একই পরিমাণ চালের দাম ছিল ৩৯০-৩৯৬ ডলার। বছরের শেষ নাগাদ থাই চালের দাম আরো কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া ওই সময় দেশটিতে উৎপাদিত চালের মৌসুমি চাহিদাও কমে আসবে।

ভিয়েতনামের চালের বাজারের প্রধান ক্রেতা বরাবরই চীন। এবার বাংলাদেশও উঠে এসেছে শীর্ষ ক্রেতার তালিকায়। ভিয়েতনামের রফতানিকারকরা এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আড়াই লাখ টন চাল সরবরাহ আদেশ নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি ৫০ হাজার টন অর্ধসিদ্ধ চাল আমদানির ঘোষণা দেয়ায় রফতানির পরিমাণ আরো বাড়বে বলে মনে করছেন দেশটির ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশের পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকে দেড় লাখ ও ফিলিপাইন থেকে ১ লাখ ৭৫ হাজার টন চাল সরবরাহের আদেশ পেয়েছে দেশটি।

বাংলাদেশের চাহিদার কারণে চাল রফতানির লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়েছে ভিয়েতনাম। ভিয়েতনাম ফুড অ্যাসোসিয়েশন এ বছর চাল রফতানির লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৫৬ লাখ টন নির্ধারণ করেছে। বছরের প্রথম নয় মাসেই তারা রফতানি করেছে ৪৫ লাখ টন চাল। ভিয়েতনামের চাল রফতানিতে বাড়তি গতি সঞ্চার করেছে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বাংলাদেশের আমদানি চাহিদা। তবে ভিয়েতনামেও চালের বাজার এখন নিম্নমুখী। দেশটি ৫ শতাংশ ভাঙা চাল এখন বিক্রি করছে প্রতি টন ৩৮৫-৩৯৫ ডলারে। গত সপ্তাহে এ মূল্যস্তর ওঠানামা করেছে টনপ্রতি ৩৯০ থেকে ৩৯৫ ডলারের মধ্যে।

এশিয়ার চালের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান ক্রেতা হয়ে ওঠার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আমদানিকারকরাও। চট্টগ্রামের ভোগ্যপণ্যের অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স এ জামান ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. নূর আলম বলেন, বাংলাদেশী ক্রেতারা এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানিতে শীর্ষে রয়েছে। তবে মজুদবিরোধী অভিযানের কারণে ঋণপত্র খুলেও অনেকে চালের শিপমেন্ট পিছিয়ে দিচ্ছেন। ফলে বাংলাদেশে আমদানি হ্রাস পেতে পারে, এমন আশঙ্কায় রফতানিকারকরা চালের দাম কমিয়ে দিচ্ছেন।

কয়েক বছর ধরেই দেশে চাল উৎপাদন বাড়ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছর আউশ, আমন ও বোরো মিলে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছিল মোট ৩ কোটি ৩৪ লাখ টন। ২০১০-১১ অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ কোটি ৩৫ লাখ টনে। ২০১১-১২ অর্থবছর তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি ৩৯ লাখ, ২০১৩-১৪ অর্থবছর ৩ কোটি ৪৩ লাখ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছর ৩ কোটি ৪৭ লাখ টনে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর ৩ কোটি ৪৭ টন চাল উৎপাদন হলেও ২০১৬-১৭ অর্থবছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩ কোটি ৪৮ লাখ টন।

তবে গত বোরো মৌসুমে হাওড়ে বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি হয়। এতে নষ্ট হয় ১০ লাখ টন চাল। দ্বিতীয় দফা বন্যায়ও আমনের ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি সংগ্রহ অভিযানে ব্যর্থতায় সরকারের মজুদও অস্বাভাবিক কমেছে। সরকারের মজুদ বৃদ্ধি ও বাজার স্বাভাবিক রাখতে তাই এশিয়ার সব বাজার থেকেই এ বছর চাল আমদানি করা হচ্ছে।

এ থেকে উত্তরণে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে জানান সাবেক খাদ্য সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি অনুপাতে খাদ্যের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে না পারার পাশাপাশি নানা দুর্যোগের কারণে দেশে খাদ্যের এ সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। এছাড়া ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অনেকখানি দায়ী।
বণিকবার্তা

About admin

Check Also

দেশের ৮৩ শতাংশ দর্শক বিটিভি দেখেন: তথ্যমন্ত্রী

স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্ব টেবিলে উপস্থাপন করা হয়। তথ্যমন্ত্রী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *