Home | সাক্ষাৎকার | বিপক্ষের মত ঘায়েল করতেই ৫৭ ধারা

বিপক্ষের মত ঘায়েল করতেই ৫৭ ধারা

ড. শাহদীন মালিক, বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ। ষোড়শ সংশোধনী, তথ্যপ্রযুক্তি আইনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। যুক্তি তুলে ধরেন ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পক্ষে। ‘বিরোধীপক্ষকে ঘায়েল করতেই তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা’ বলেও মন্তব্য করেন। হতাশা প্রকাশ করেন সামনের জাতীয় নির্বাচন নিয়েও। তিন পর্বের ধারাবাহিকের শেষটি আজ প্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : অধিকার হরণের বিধান বলা হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাকে। এনিয়ে আপনার অভিমত কী?ড. শাহদীন মালিক : ১৯৬০ সালের প্যানাল কোডে ৫১১টি ধারা আছে। সকল অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু কেউ কী বলেছেন, প্যানাল কোডের অমুক ধারাটির অপপ্রয়োগ হচ্ছে? দেড়শ বছর আগের আইন, আমাদের এখানে ফৌজদারি আইন লেখার আগে সেটাই ছিল প্রধান আইন। কেউ-ই সেই আইনের ধারা প্রয়োগ নিয়ে আপত্তি তোলেননি।

শত্রু বা বিপক্ষের মত ঘায়েল করতেই ৫৭ ধারা। নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্য এসব আইন না। যারা আইন লিখছেন তাদের বেশির ভাগেরই আইন লেখার যোগ্যতা ও দক্ষতা নেই। প্রথমত, আইন তৈরি করার উদ্দেশ্য হচ্ছে অসৎ। দ্বিতীয়ত, অদক্ষ লোক দ্বারা আইন লেখা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সময় বিশেষ ক্ষমতা করা হলো। ওই আইনের বলে হয়ত তিন হাজার বিরোধী লোককে হেনস্তা করেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ওই আইনের বলে আওয়ামী লীগের হয়ত তিন লাখ মানুষকে হেনস্তা করা হয়।
৫৭ ধারা নিয়ে বিএনপি এখন কিছু বলছে না। কারণ তারা অপেক্ষায় আছে। ক্ষমতায় গেলে এ আইন দিয়েই আওয়ামী লীগের লোকদের ভালো করে বুঝিয়ে দেবে বিএনপি।

জাগো নিউজ : এ আইনের দুর্বলতা নিয়ে কী বলবেন?
ড. শাহদীন মালিক : কোনো অপরাধের শাস্তি দিতে আইন করতে হলে সেই অপরাধকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। সংজ্ঞায়িত না থাকলে আইনের অপপ্রয়োগ হতে বাধ্য। ফৌজদারি আইনে অপরাধ হচ্ছে, এতে যে ক্ষতি হচ্ছে তা দেখা যায়, বোঝা যায় এবং মাপা যায়। এখন কারও ভাবমূর্তি নষ্ট হলো এবং এর জন্য মামলা হলো; কার ভাবমূর্তি, কিসে নষ্ট হয় এবং তার পরিমাপ কী- তা যদি নির্ধারিত না হয়, তাহলে শাস্তি দেবেন কিসের ভিত্তিতে?

আমাদের মতো দেশে সভ্য-অসভ্য যেখানে ঝাপসা সেখানেই মানহানী, ভাবমূর্তি নিয়ে নানা কথা এবং মামলা করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকা নিয়ে একজন উপজেলা নির্বাহীকে কারাগারে যেতে হলো। এখন ভয়েই তো অনেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকবে না। অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আইন করলে ভবিষ্যতে ন্যায় বিচার বলতে আর কিছু থাকবে না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না বলেই এ ধরনের আইন হয়ে থাকে।
জাগো নিউজ : তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি উঠেছে। আপনি কী মনে করছেন?

ড. শাহদীন মালিক : মানহানি, কটাক্ষ, ভাবমূর্তি- এগুলো ফৌজদারি আইনে এনে কোনো বিচার হতে পারে না। এগুলো দেওয়ানি আইনের ব্যাপার। অপব্যবহার হবে বলে দু’শ বছর আগে ফৌজদারি আইন থেকে তা বাদ দেয়া হয়।
ব্লাসফেমি (ধর্ম অবমাননা) আইনে পাকিস্তানে প্রতিনিয়ত ফাঁসির ঘটনা ঘটছে। একটি সভ্য সমাজে এমন বিধান থাকতে পারে না। একজন মুসলমান হিন্দু বিধান মানবে না এবং একজন হিন্দু মুসলমানদের বিধান মানবে না- এটাই স্বাভাবিক। এ কারণে তো শাস্তি হতে পারে না।

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ হচ্ছে, মানুষকে হেনস্তা করতে এটি সহায়তা করছে। এটিকে ফৌজদারি আইনের বিধানে আনা যাবে না। ৫৭ ধারার পক্ষে আমি একটি যুক্তিও দেখি না।
জাগো নিউজ : রাজনীতিতে নির্বাচনের হাওয়া বইছে। হালচাল কেমন দেখছেন?

ড. শাহদীন মালিক : সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভবনা ক্ষীণ।
জাগো নিউজ : আপনি তো আশাবাদী মানুষ।
ড. শাহদীন মালিক : এই মুহূর্তে আমি আশাবাদী না। আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণও নেই। আ স ম রবের বাসায় ঘরোয়া সভা ছিল। সরকার পুলিশ দিয়ে তা বন্ধ করে দিল। বিএনপি মাঠে দাঁড়াতেই পারেনি। সরকারের আচরণে সহনশীল হওয়ার কোনো লক্ষণও নেই।

ফরহাদ মজহার নিয়ে সরকার খেলছে। ওই ঘটনা দিয়ে সরকার অন্যান্য গুম, নিখোঁজের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। গুমের ঘটনা আসলেই ফরহাদ মজহারের ঘটনা সামনে আনার চেষ্টা করবে সরকার।
এসব কারণে সরকারের আচরণে আস্থা পাচ্ছি না। আর এ কারণেই আশাবাদী হতে পারছি না।

জাগো নিউজ : এমন বিষয় নির্বাচনে কী প্রভাব ফেলতে পারে?
ড. শাহদীন মালিক : এসবের মধ্যে সরকারের আচরণ প্রকাশ পায়। নির্বাচনে সরকার কতটুকু ছাড় দেবে এবং সহনশীল হবে, তা এসব ঘটনায় প্রমাণ মেলে।
দেশের ইতিহাসে ১০টি নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি হয়েছে সরকারি দলের অধীনে। আর বাকি চারটি হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। সরকারি দলের অধীনে যে কয়টি নির্বাচন হয়েছে প্রতিটিতেই ক্ষমতাসীন দল দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছে। আওয়ামী লীগ দু’বার, বিএনপি দু’বার এবং জাতীয় পার্টি দু’বার বিজয়ী হয়েছে। আমাদের এখানে এটিই তো নির্বাচনের ইতিহাস।

নির্বাচন কিন্তু প্রতিবারই সংবিধানের আলোকেই হয়েছে।
জাগো নিউজ : তার মানে সামনে সংকট আরও ঘনীভূত হবে?
ড. শাহদীন মালিক : অস্থিতিশীলতা বাড়বে। সরকার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। অরাজকতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।
জাগো নিউজ : অন্য কোনো বিকল্প শক্তি?

ড. শাহদীন মালিক : সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসতে চাইলে আমিই ট্যাংকের সামনে গিয়ে দাঁড়াব। মানুষ আর সে শক্তি চায় না।
জাগো নিউজ : অনেকেই তো মনে করেন সামরিক আদলেই রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে?
ড. শাহদীন মালিক : আমরা তো প্রতিবাদ করছি। মানুষ তো এমন শাসন চায় না। বলতে হয়, এরপরও রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা। ছুরি নিজের হাতে আছে। তা একসময় কাজে লাগানো যাবে। কিন্তু ছুরি নিজেই যদি কাজ করতে চায়, তাহলে তো তার কাজ বন্ধ করতে ঝাঁপিয়ে পড়তেই হবে।

About admin

Check Also

‘সংসদ বহাল রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়’

ড. দিলারা চৌধুরী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর। বাংলাদেশ অ্যান্ড দি সাউথ …

Leave a Reply