Home | সাক্ষাৎকার | ‘আমাকে এবং ছাত্রলীগকে মুখোমুখি দাড় করাতে চাচ্ছে’ কিছু কুচক্রী মহল

‘আমাকে এবং ছাত্রলীগকে মুখোমুখি দাড় করাতে চাচ্ছে’ কিছু কুচক্রী মহল

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডাঃ ইমরান এইচ সরকার বলেন, “সম্প্রতি স্বাধীনতা বিরোধী জামাত, আদর্শচ্যুত লক্ষ্যভ্রষ্ট কিছু বাম সমর্থক এবং কিছু সুশীল সাজা অনলাইন এক্টিভিস্ট আমার প্রতি তাদের মিথ্যে সিম্প্যাথি দেখানো এবং উস্কানিমূলক লেখা দিয়ে সরকারকে বিব্রত করতে আমাকে এবং ছাত্রলীগকে মুখোমুখি দাড় করাতে চাচ্ছে”।

তিনি বলেন, “২০০২-০৩ সালে জামায়াত-বিএনপি জোট যখন ক্ষমতায় তখন আমরা কতটা ঝুঁকি নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতি করতাম সেটা আমার শত্রুরাও স্বীকার করে এখনো। এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই।

জীবনের ঝুঁকি থাকা স্বত্বেও আমরা তখন ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে বিচ্যুত হইনি। তখন আমি রংপুর মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলাম।

এরপর পরীক্ষা, পড়াশোনার চাপ এবং পরিবারকে সময় দিতে গিয়ে আর ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সেভাবে আর সক্রিয় থাকতে পারিনি।

হ্যাঁ কিছু সময় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় ছিলাম, কিন্তু তার মানে এই না যে ছাত্রলীগের আদর্শ ত্যাগ করেছি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেছি”। কথাগুলো ইমরান এইচ সরকার মোবাইল ফোনে জানান।

গতকাল আদালত প্রাঙ্গণে হট্টগোল এবং দেশের চলমান অবস্থা নিয়ে একটি সাক্ষাৎকারের জন্য ইমরান এইচ সরকারকে বলা হলে গণজাগারণ মঞ্চের মুখপাত্র মোবাইল ফোনে জানান “ইন্টারভিউ, মিডিয়া, প্রেস এই ব্যাপারগুলোতে এখন বড়ই বিরক্ত; অনেক তো হল আর কত?

এসব বিষয়ে এখন ক্লান্তিবোধ করি। যদি আড্ডা দিতে চান তাহলে চলে আসুন আড্ডা দেয়া যাবে; চায়ের সাথে কথা বলা যাবে। সময় এবং স্থানের ঠিকানা দিয়ে তিনি ফোন রেখে দেন।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে মিন্টো রোডের ঠিকানায় পৌছে যাই সিকিউরিটিকে পরিচয় দেয়ার পরে ভিতরে নিয়ে (সম্ভবত আগেই ইনফর্ম করা ছিল) গার্ডেনে দেয়া চেয়ারে বসতে বলে ভিতরে তাকে খবর দিতে চলে যায়।

কিছুক্ষণ পরে ইমরান এইচ সরকার মুখে তার চিরচেনা হাসি নিয়ে উপস্থিত হলেন। কুশল বিনিময়ের পরে বললাম ‘যেহেতু আপনি অনেক ব্যাস্ত থাকেন তাই আপনার সময় নষ্ট করবো না আমরা শুরু করতে পারি’ তিনি সম্মতি প্রকাশ করেন (এর মধ্যে অবশ্য চা চলে আসে)।

সাক্ষাৎকারটি নিচে দেয়া হলো:

বীরেন সাই: গতকাল আদালত প্রাঙ্গণে হট্টগোল প্রসঙ্গে কিছু বলুন?

ইমরান এইচ সরকার: এ বিষয়ে অবশ্য গতকাল ফোনে আমি আপনাকে বলেছি এটা সম্পূর্ন ছাত্রলীগের নিজস্ব ব্যাপার, প্রাক্তন ছাত্রলীগের সাথে বর্তমান ছাত্রলীগের ভুল বোঝাবুঝি।

এ সুযোগটাকে কাজে লাগাতে স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত, লক্ষ্যভ্রষ্ট বাম, কিছু সুশীল নিরেপেক্ষ ভেকধারী অনলাইন এক্টিভিস্ট আমার প্রতি মিথ্যা মায়া দেখিয়ে সরকারকে বিব্রত করতে সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ইস্যু ক্রিয়েট করতে চাচ্ছে। যাতে ছাত্রলীগ এবং ইমরান এইচ সরকার মুখোমুখি অবস্থান নেয়।

একটু খেয়াল করলে দেখবেন প্রথমে তাদের অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো ছেপেছিল ‘ইমরান এইচ সরকারের উপরে আদালত প্রাঙ্গণে ছাত্রলীগের লাঠিসোটা নিয়ে হামলা’ আবার ‘ইমরান এইচ সরকারের উপরে ছাত্রলীগের বোমা হামলার পরিকল্পনা’ কিছু সময় পর এসব খবরগুলো যখন মিথ্যা হিসেবে প্রমাণিত হল তখন নিউজ আসল ‘ইমরান এইচ সরকারের গাড়িতে ছাত্রলীগের ডিম নিক্ষেপ’।

হ্যাঁ, এবার এ প্রসঙ্গে বলি, আপনি চোখ কান খোলা রাখলে দেখতে পাবেন বিগত কয়েক বছরে লোকাল আওয়ামী লীগের নেতারা টাকার বিনিময়ে কিংবা ব্যবসা বা অন্যান্য সুবিধার বিনিময়ে প্রচুর স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবির আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগে যোগদান করায়, কমিটিতে ভালো পোস্ট দেয় এমনকি স্থানীয় নির্বাচনগুলোতেও প্রার্থী হিসেবে অনুমোদন দেয়।

এরা সবাই আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগে প্রবেশ করেছে জামায়াতের হাইকমান্ডের নির্দেশে যাতে অপকর্ম করলে তার দায়ভার আওয়ামী লীগের উপরে বর্তায়। এদের সেই ছক অনুযায়ী স্বাধীনতা বিরোধী ছাত্রশিবিরের ছেলেপেলে এবং বহিরাগত কিছু ছেলেরা ছাত্রলীগের ভেক ধরে আমার গাড়িতে ডিম নিক্ষেপ করে যাতে ছাত্রলীগের নাম আসে।

পরে গাড়ি ঘুরিয়ে আদালত প্রাঙ্গণে ফিরে আসার পরে বর্তমান ছাত্রলীগের নেতারা সেখানে আসেন তারা জানান ‘ছাত্রলীগের এমন কোনো কর্মসূচী ছিলনা বা জানা নেই। এ নিয়ে কিছুটা কথা কাটাকাটি সাময়িক হট্টগোল হয় পরে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়। কিন্তু মিডিয়াতে ব্যাপারটা অন্যভাবে আসে।

খুবই ক্লিয়ার ম্যাসেজ। আমি একজন এক্স ছাত্রলীগার তাই এই ভুল বোঝাবুঝি সম্পূর্ন ছাত্রলীগের নিজস্ব ব্যাপার। এ বিষয়ে বাইরের মানুষের জল ঘোলা করে সেখানে মাছ শিকারের কোনো অবকাশ নেই।

বীরেন সাই: আমরা যতটুকু জানি ছাত্রলীগেরই কেউ আপনার নামে মামলা করে।

ইমরান এইচ সরকার: এটা সত্য ছাত্রলীগের কেউ একজন এই মামলা করে। আমি একজন এক্স ছাত্রলীগার বলে আমার নামে ছাত্রলীগের কেউ মামলা করতে পারবেনা এ কথা কিন্তু কোথাও বলা নেই। আমাদের এসব ধ্যান ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

আইন এবং দেশের শাসন ব্যবস্থাকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া উচিৎ। সেখানে কারও হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। আর হ্যাঁ সেই মামলায় অবশ্য আমাকে জামিন দেয় আদালত। আমরা আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।

বীরেন সাই: হ্যাঁ গতকাল আদালত প্রাঙ্গণে হট্টগোল নিয়ে আপনার কাছথেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেল। এবার আপনার অতীত ছাত্রলীগ জীবনের ভয়ংকর কিছু ঘটনা বলুন।

ইমরান এইচ সরকার: ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পরে সারাদেশে হিন্দু নির্যাতন এবং তাদের তান্ডবলীলা ব্যাপকহারে বেড়ে যায়। সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সুযোগ বুঝে পালিয়ে যায়। মারধর হত্যার হুমকি মামলা মাথায় নিয়ে মাঠে মাটি কামড়ে পরে থাকেন আওয়ামী লীগের আদর্শের কিছু নেতাকর্মীরা এবং মাঠ পর্যায়ের মানুষজন।

পরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীন সময়ও এসব মাথায় নিয়েই আমাদের ছাত্রলীগের রাজনীতি করতে হত। আমি তখন সেখানকার ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলাম। তখন হোষ্টেলের সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রণ ছিল স্বাধীনতা বিরোধী ছাত্র শিবিরের হাতে। ওরা রুমে রুমে গিয়ে ছাত্রলীগ খুঁজত।

ওদের জন্য ঠিকমতো রুমে থাকতে পারতাম না ক্লাস করতে পারতাম না। তখন খুবই দুঃসময় পার করেছি আমরা তবুও পালিয়ে যাইনি এসবের ভেতর থেকেই ছাত্রলীগের বিভিন্ন প্রোগ্রাম কর্মসূচী এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছিল।

সবচেয়ে ভয়ংকর যে ব্যাপারটা ছিল তা হল শিবিরের প্রায় প্রতিটা সাধারণ কর্মীকে ছাত্র শিবিরের বড় ভাই, নেতা কিংবা সাথীর কাছে সমকামিতায় বাধ্য করা হত। এটা নাকি দলীয় কোড অব কন্ডাক্ট! গভীর রাতে সেই ছাত্রদের আর্তনাদ অনেকের ভেতরে ভয় ধরিয়ে দিতো। ঘুমাতে পারতো না কেউ।

এমনও দিন গেছে, রাতেই অনেককে হাসপাতালে শিফট করতে হতো। পরের কিছুদিন তারা সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারতো না, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতো। কুৎসিত এসব কারন দেখে মনে হতো রাজনীতিতে শুভ দিন আনতেই হবে।

আর ছাত্রদল প্রসঙ্গে বললে ওরা নিজেদের ধান্ধায় থাকতো সবসময় নেশাপাতি করতো মাঝেমাঝে ছাত্রলীগের ছেলেদের মারধোর করত মন চাইলে বা ক্যাম্পাসে নাম কামাতে চাইলে। ক্যাম্পাসের ভিতরে এবং আশেপাশে টেন্ডার চাঁদাবাজির নিয়ে ব্যাস্ত থাকতো। শিবিরের ছেলেরা ওদের তেমন ঘাঁটতে যেতনা।

বীরেন সাই: ছাত্রলীগ ছাড়লেন কবে? তাহলে তো আপনি এখন ছাত্রলীগের বাইরে বা তাদের কোনো কর্মকান্ডে আপনাকে দেখা যায়না। ভবিষ্যতে পেশা হিসেবে ডাক্তারিতে ফেরার সম্ভবনা কতটুকু?

ইমরান এইচ সরকার: আসলে মেডিকেলের শেষ দিকে পড়াশোনার প্রচন্ড চাপ এবং পরিবারকে সময় দিতে গিয়ে ছাত্রলীগ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হই। কিন্তু ছাত্রলীগ ত্যাগ করিনি।

হ্যাঁ, যেহেতু বিয়ে করে ফেলেছি সেই হিসেবে এখন ছাত্রলীগ করা যায়না। কিন্তু সেটা তো আর আওয়ামী লীগের আদর্শের পরিপন্থী না অথবা আনুষ্ঠানিকভাবে আমি তো এখনো কোনো রাজনৈতিকদলে যোগদান করিনি তাহলে আমার আদর্শ আগে যা ছিল তাই এখন পর্যন্ত বলবত্‍।

আর পেশা হিসেবে ডাক্তারিতে আমি তেমন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করিনা। এজন্য আর ওমুখো হইনি। তাছাড়া সরকারী হাসপাতালের পরিবেশটাতে আসলে ততোটা স্বাচ্ছন্দ্য নই এখনো।

ফিউচার প্ল্যান বলতে কিছুদিন আগে ঈদের পরে আমি কুড়িগ্রাম-৪ নিজ আসনে গিয়ে অনুরাগী আর ভক্তবৃন্দকে নিয়ে এলাকাবাসীর সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করে এসেছি। রাজনীতি নিয়ে ভিন্ন কিছু চিন্তা ভাবনা আছে।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের দিকে চোখ রেখেছি। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে হয়তো সেদিকে উল্লেখযোগ্য সময় দিতে পারি। তবে এ ব্যাপারে এখনই কিছু বলতে চাচ্ছিনা। সময় এলে ঘোষণা দেয়া হবে।

বীরেন সাই: যাই হোক, আপনি বার বার ঘড়ি দেখছেন, বুঝতে পারছি আপনার গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ আছে নিশ্চয়। আজ উঠবো, তবে আপনার সাথে আমার আরেকটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। কিছু কথা বাকি থেকে গেল। আজকের সময়টুকুর জন্য ধন্যবাদ।

ইমরান এইচ সরকার: আপনাকেও ধন্যবাদ।

বীরেন সাই
কোলকাতা

About admin

Check Also

‘সংসদ বহাল রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়’

ড. দিলারা চৌধুরী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর। বাংলাদেশ অ্যান্ড দি সাউথ …

Leave a Reply