Home | সাক্ষাৎকার | নির্বাচনের আগে বিতর্কিত হতে চাই না

নির্বাচনের আগে বিতর্কিত হতে চাই না

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক। জন্ম ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে ১৯৬৮ সালে এইচএসসি পাস করেন। বোর্ডে প্রথম স্থান লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা অসম্পন্ন রেখেই ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্থান মিলিটারী একাডেমী কাকুল-এ যোগ দেন তিনি। সেখানেও কমিশনকালে নিজের ব্যাচে প্রথম স্থান অধিকার করেন। কমিশন পেয়ে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান করেন।
পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে তিনি বিএ পাস করেন। ৫৪ বছর বয়সে ২০০৪ সালে তিনি মাস্টার্স ইন ডিফেন্স স্টাডিজ শেষ করেন। ২০০৭ সালে পলিটিক্যাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্টে নাম লেখান পিএইচডি করার জন্য। রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে তা শেষ করতে পারেননি। তবে তা সম্পন্ন করার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। উচ্চতর সামরিক লেখা পড়ার জন্য, এক বছর মেয়াদে যুক্তরাজ্য ও এক বছর মেয়াদে আমেরিকায় ছিলেন।

নয় মাস রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধ করেন মেজর (অব.) ইবরাহিম। তার সাহসিকতার জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার তাকে বীর প্রতীক উপাধি দেয়। সেনাবাহিনীতে যত প্রকার কমান্ড হয় সবগুলিতে তার অংশগ্রহণ ছিল সরব। মর্যাদাপূর্ণ যত প্রকার শিক্ষকতা ও স্টাফ দায়িত্ব অর্পন করা হয়, তার সবই পালন করেছেন তিনি। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যান। স্বস্ত্রীক হজ্ব সম্পন্ন করেছেন। বহু দেশ সফর করেছেন।

তার লেখা ১২টি বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিশ্লেষন নিয়ে- ‘মিশ্র কথন’, ‘পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ণ’এবং ইসলামের ইতিহাসে প্রাথমিক একশো বছর ধরে যে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলো হয়েছে তার বিশ্লেষন মূলক: ‘ব্যাটলস অব ইসলাম।’

দেশের প্রথম সারির দৈনিক পত্রিকাগুলোতে তিনি নিয়মিত কলাম লেখেন। গত ষোল বছর যাবৎ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে টকশোতে কথা বলেন এই অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা তথা রাজনীতিক।

তার স্ত্রী ফোরকান ইবরাহিম। তারা তিন ভায়রা রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা। দুইজনই বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত। তার মেয়ের ঘরে দুই ছেলে ও ছেলের ঘরে এক ছেলে রয়েছে। ছেলে ব্যাংকার। মেয়ে গৃহিনী। তার জামাতা বড় একটি গার্মেন্টস কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি ১৯৯৫ সালে মিলিটারী একাডেমীর কমান্ডেন্ট থাকাকালে ‘স্বাধীনতা মানচিত্র’ নামের একটি মুক্তিযুদ্ধের স্মরক ভাষকার্য স্থাপন করেন। সেই মানচিত্র বা ভাস্কর্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সেখানে কোনো মানুষের মূর্তি নেই।

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক বর্তমান রাজনীতি, আগামী নির্বাচন ও সরকারের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন যমুনা নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে। পাঠকদের জন্য পুরো সাক্ষাৎকারটি (প্রথম পর্ব) তুলে ধরা হলো-
যমুনা নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: ষোড়ষ সংশোধনী বাতিলের মধ্য দিয়ে ফিরে যাওয়া হলো না বাহাত্তরের সংবিধানে। এই বিষয়ে আপনার মতামত কী?

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক: আমি ষোড়ষ সংশোধনী সম্পর্কে দুটি কথা বলব। যুক্তি উপস্থাপন করব। সেখানে একটি তির্যক যুক্তিও থাকবে। জন্মের আগে মৃত্যুর চিন্তা করার সুযোগ কোনো শিশু পায় না। এর অর্থ হচ্ছে, উচ্চতর আদালতে বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া ও মানদণ্ড ইত্যাদি প্রসঙ্গে কোনো আইন বাংলাদেশে বিদ্যমান নেই। বাংলাদেশের কোনো সময়ের পার্লামেন্টেই এই বিষয়ে কোনো আইন করেনি। কিন্তু বিচারকগণের অপসারণ নিয়ে কেন এতো অস্থির হয়ে গেলেন বর্তমান সরকার? তার মানে, এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো একটি অপ্রকাশিত উদ্দেশ্য আছে। অনেকেই বলেন, বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক মহোদয় সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছার সঙ্গে কমপ্রোমাইজ করেছিলেন। ভবিষ্যতে যদি কোনো বিচারক কম্প্রোমাইজ না করেন, তাহলে তার ওপর যেন চাপ সৃষ্টি করা যায়, এইরূপ উদ্দেশ্যেই বর্তমান আওয়ামী লীগীয় পার্লামেন্ট ষোড়ষ সংশোধনীটি করেছিলেন।

যে পদ্ধতিটি নিয়ে তাঁরা কথা বলছেন, সেটা হলো ১৯৭২ সালের সংবিধানের কথা। তাহলে ওনারা প্রকাশ্যে বলুক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ১৯৭৫ সালে যে সংশোধনী এনে পার্লামেন্টের হাত থেকে ক্ষমতা নিয়ে শুধু প্রেসিডেন্টের কাছে দিয়েছিলেন সেইটি ভুল ছিল? আমি নৈতিক অসততার নিন্দা করছি। তাঁরা শুধু বলেন, জিয়াউর রহমান সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল করে দিয়ে গেছেন। জিয়াউর রহমান তা করেছিলেন কেন—এইটা তাঁরা বলেন না! জিয়াউর রহমান মনে করেছিলেন যে, শুধু প্রেসিডেন্ট একক ক্ষমতাবলে বিচারপতি অপসারণের কাজটি করা ঠিক নয়। তাই, প্রেসিডেন্টকে উপযুক্ত ও চূড়ান্ত পরামর্শ দেয়ার জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বাইরে যাবেন না। এতে এটা পরিষ্কার যে, জিয়াউর রহমান তাঁর একার হাতে এই ক্ষমতা রাখেননি। আসলে নাচতে না জানলে চলন বাঁকা! জিয়াউর রহমানের নামটিই বর্তমান সরকারের কাছে তিতা। তাই তার ওপর বার বার আক্রমণ করছেন।

আমি মনে করি, আমাদের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে পার্লামেন্টের কাছে এই ক্ষমতা দেয়া যায় না। ১০ অ্যামিকাস কিউরিগণের মধ্যে, একজন ব্যতীত সকলেই এই মতের পক্ষে বলেছেন। ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, ড. কামাল হোসেন তাঁরাও কিন্তু এই সংশোধনী বাতিলের পক্ষে বলেছেন। আওয়ামী লীগের অধৈর্য্য, অসহিষ্ণুতার জলন্ত প্রমাণ হলো, কামাল হোসেন ও আমিরুল ইসলামের মতো আইনজীবীদের প্রসঙ্গেও সংসদে অশোভন আলোচনা হয়েছে। এই উভয়ের মুক্তিযুদ্ধকালীন অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বঙ্গবন্ধুর সাথে এই উভয়ের সাহচর্যের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা উজ্জলভাবে লেখা থাকবে। আমি মনে করি, ষোড়ষ সংশোধনী বিষয়ক চ্যাপ্টার ক্লোজড। রিভিউতে গেলেও এখন কোনো পরিবর্তন আসবে বলে আমার মনে হয় না।

আমার পক্ষ থেকে একটি পয়েন্ট স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। ২০১১-১২ সালের বিচারপতি খায়রুল হক মহোদয়ের নেতৃত্বাধীন রায়টি হয়েছিল মেজরিটি বিচারকের রায়; দ্বিমত পোষনকারী বিচারকও ছিলেন। কিন্তু ২০১৭ তে বিচারপতি সিনহা মহোদয়ের নেতৃত্বাধীন রায়টি হয়েছে সর্বসম্মত সাত বিচারকের ফুল বেঞ্চ এর রায়ে।

এই প্রসঙ্গে আমার পক্ষ থেকে আরেকটি পয়েন্ট স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। কোন পার্লামেন্ট করেছিল সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো, বাংলাদেশের পার্লামেন্ট আইন পাস করেছিল ১৯৯৬ সালে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রসঙ্গে। কিন্ত ২০১১ সালের মে মাসে, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ওই সংশোধনীকে বা আইনকে, অবৈধ ঘোষণা করেন। তখন তো বাংলাদেশের (২০১১-১২ সালের) পার্লামেন্ট বলেন নাই যে, পার্লামেন্ট কর্তৃক পাস করা আইন আপনারা সুপ্রিম কোর্ট কেন অবৈধ ঘোষণা করছেন? তাহলে এখন ২০১৭ সালের জুলাই মাসে, আপনারা তথা বর্তমান পার্লামেন্ট, কেন বলছেন যে, বিচার বিভাগ পারলমেন্টের সার্বভৌম ক্ষমতার ওপর হাত দিচ্ছে।

একটি পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায়, প্রকাশ করা হয়েছে, পার্লামেন্টের আলোচনা থেকে উদ্ধৃত করা কয়েকটি খাস বাক্য। যথা একটি বাক্য হলো এইরকম: “ বিচার বিভাগের হাত থেকে পার্লামেন্টের হাত লম্বা ”। মনে হচ্ছে এটা আমেরিকার রেসলিং ফেডারেশনের রেসলিংয়ে ব্যস্ত দুইজন রেসলার বা কুস্তিগীর এর মধ্যে কার হাতটি লম্বা, কে আগে ঘুষিটা মারতে পারবে, সেই ধরনের বক্তব্য। বিভিন্ন কলামে, টকশোগুলোতে অংশগ্রহণকারীগণ বলছেন, এইরূপ কথাবার্তার ধরণ ও বাক্য বিন্যাস কোনো মতেই পার্লামেন্টিরিয়ানদের পক্ষ থেকে কাম্য হতে পারে না। আমরা দুঃখিত যে, এরূপ ঘটনা ঘটছে।

যমুনা নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: সম্প্রতি সংসদে বিচার বিভাগ ও প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে যে বিষোদগার করা হয়েছে। বিষয়টি আপনি কিভাবে নিচ্ছেন?

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক: এ বিষয়ে আগে কিছু কথা বলেছি। সম্মানিত প্রধান বিচারপতি হলেন সাংবিধানিকভাবেই তথা ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স মোতাবেক, রাষ্ট্রের চতুর্থ ব্যক্তি। ধারাবাহিকতায় প্রথমে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও এরপর প্রধান বিচারপতি। বাংলাদেশে সাংবিধানিক অঙ্গনের তিনটির মধ্যে, একটির প্রধান তিনি। বিচার বিভাগ বলতে শুধু প্রধান বিচারপতিকে বুঝায় না। সর্বকনিষ্ঠ বিচারপতি থেকে প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত সবাইকে নিয়েই বিচার বিভাগ। বাংলাদেশের সংবিধান, আপিল বিভাগকে একটি ক্ষমতা দিয়েছে যা সংসদের নেই। সেটা হলো, সংসদ আইন প্রনয়ন করলেও, ওই আইনটি সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা এই প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত দেবার ক্ষমতা ( আপিল বিভাগের)। ব্যক্তিগতভাবে প্রধান বিচারপতিকে এ রকম আক্রমণ করাটা অত্যন্ত অসৌজন্যমূলক এবং আগামী প্রজন্মের আইন প্রনেতাগণ বা সংসদ সদস্যগণের জন্য একটি মন্দ দৃষ্টান্ত।

যমুনা নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: বিএনপি বা আপনাদের জোটের পক্ষ থেকে সহায়ক সরকারের দাবি সংবিধানের বর্তমান অবস্থায় কতটুকু যৌক্তিক বলে আপনি মনে করেন?

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক: বর্তমান সংবিধানটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংশোধন করা হয়েছে একান্তই তাদের সুবিধার্থে। এই দলটি তিনটি মন্দ কাজ করেছে। প্রথমটি হলো, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে নির্বাচন প্রসঙ্গে। যাতে করে নির্বাচনকালীন সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীকে আমন্ত্রণ জানাতে না পারে। দ্বিতীয়টি হলো, আওয়ামী লীগ সরকার বিনা উস্কানিতে ও বিনা আহ্বানে, গণভোটের বিধান সংবিধান থেকে বাদ দিয়েছে। তৃতীয়টি হলো, ‘না’ ভোটের বিধান ছিল আরপিওতে, সেটাও বাদ দিয়েছে।

অতএব আগামী দিনের নির্বাচন কী পরিবেশে হবে আমরা জানি না। তবে আমরা সবাই নির্বাচন চাই। নির্বাচনমুখী দল বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিশ দলীয় জোট। কিন্তু নির্বাচনকালীন যদি কোনো দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকে তাহলে, বাংলাদেশ সরকারের আমলাতন্ত্র, বাংলাদেশে নির্বাচনের সঙ্গে দায়িত্বপালনকারী সকল কর্মকর্তারা নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কিনা, বাংলাদেশের মানুষের বিবেকের কাছে এই মর্মে প্রশ্ন রাখছি। এমন একটি সরকার প্রয়োজন যে সরকার বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করবে সর্বোত্তভাবে। সাম্প্রতিককালেও গত নির্বাচন কমিশন, একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে, সেনাবাহিনী মোতায়েনের জন্য আবেদন করেছিল; সরকার অনুমোদন দেয়নি। সংবিধান মোতাবেক, বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক মহোদয় কর্তৃক লেখা রায়ে, বলা আছে যে, নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী সর্বপ্রকারের সহযোগিতা প্রদানে নির্বাহী বিভাগ বাধ্য। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কিছুদিন পূর্বে সেনাবাহিনী তলব করেছিল নির্বাচনে সহায়তা প্রদানের জন্য, সরকার দেয়নি। নির্বাহী বিভাগ, আগামী নির্বাচনের সময় যেসব কাজ করতে পারে বলে আমার আশঙ্কা তার মধ্যে একটি হচ্ছে, তাদের অধীনস্ত পুলিশ বাহিনীকে দিয়ে নির্বাচনের সাত-আট-দশ দিন আগে সারাদেশে অভিযান চালাবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সন্ত্রাসী নাম দিয়ে বিএনপি বা ২০ দলীয় জোটের মানুষকে গ্রেফতার করবে। এর মাধ্যমে দলীয় নেতাদের গ্রেফতার করা হবে বেশি। গ্রামের পুরুষদের বাড়ি ছাড়া করবে। কর্মীদের গ্রাম ছাড়া করবে। এরপর নির্বাচন দিয়ে বলবে কোনো মারামারি হয়নি নির্বাচনে। সুন্দর একটি নির্বাচন হয়েছে। বোমা ফোটেনি, কিরিজ ছিল না, তরবারি ছিল না, ভোটার এর লাইন লম্বা ছিল আধা কিলোমিটার ইত্যাদি ইত্যাদি। সেখানে বিশ দলীয় জোটের তো কেউ নেই।

নির্বাচনকালীন এমন একটি সরকার দরকার, যেটি সংকটাপন্ন একজন রোগীর নিকট চিকিৎসকের মতো। চিকিৎসক রোগীর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থাপত্র দেন, রোগীর প্রতি ভালবাসা একজন ডাক্তারের যেমন থাকে তেমনি ওই রোগীর পিতা-মাতারও থাকে। কিন্ত বেশি ভালবেসে পিতামাতা চিকিৎসাপত্র দিলে তো হবে না! ঠিক তেমনি, সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচনমুখী এই কথাটি আমি মেনে নিলাম, কিন্তু নির্বাচনের জন্য কোন কাজ মঙ্গলজনক হবে এটা সরকারই বুঝবে যাদের ব্যক্তিগত লোভ-লালসা নেই। ওইরূপ একটি সরকারের রূপরেখ ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কিছু দিনের মধ্যেই দেবেন। উদ্দেশ্য, এমন একটি সরকারি কাঠামো, যেই সরকারি কাঠামোর মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ নির্লোভ নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে; প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করবেন।
নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের সঙ্গে যে প্রসঙ্গটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেটি হলো, জনগণের মনে আস্থা ও বিশ্বাস ফেরাতে হবে। ফেরত আনার জন্য শুধু মুখের মিষ্টি কথায় কাজ হবে না। বাংলা ভাষায় প্রবাদ আছে, ‘মিষ্টি কথায় চিড়া ভেজে না।’বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নির্বাচন সহায়তায় ভূমিকা রাখছে কিন্তু নিজের দেশে কেন রাখতে পারবে না? তার অর্থ, বর্তমান শাসক দলের মনে কোনো দূরভিসন্ধি আছে, নিদেন পক্ষে, ভয় আছে। অর্থাৎ, একটি হলো সরকার সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতাকে ভয় পায়; দ্বিতীয়টি হলো, সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকার কারণে জনগণ যদি ঠিক মতো ভোট দিতে পারে আর ওই ভোটের কারণে আপনার যদি পরাজয় হয়, সেই ভয়েই আপনি সেনাবাহিনীকে নির্বাচনে সহায়তা করার জন্যে আনছেন না।

২৭ বছর যাবৎ ( ১৯৭০-১৯৯৬)একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে স্বাধীনতার আগে-পরে সকল জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছি। দশ বছর যাবৎ ( ১৯৯৭-২০০৭)দেশের সচেতন নাগরিক সমাজের একজন সদস্য হিসেবে সক্রিয় ছিলাম। ২০০৮ থেকে নিবন্ধিত একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।এই ত্রি-মাত্রিক অভিজ্ঞতার আলোকে, আমার দাবি ও আমার আহ্বান, বাংলাদেশ সেনবাহিনীকে নির্বাচনের সাতদিন আগে থেকে মাঠে মোতায়েন করতে হবে। যেন সেনাবাহিনীর তৎপরতার কারণে সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারীরা দূরে চলে যায়। রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো বাড়াবাড়িও না থাকে। ভোট দিতে যাওয়া মানুষের জীবনে কোনো শঙ্কা না থাকে। মানুষের মনে যে আস্থা ফিরে আসে।

চলবে…

About admin

Check Also

‘সংসদ বহাল রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়’

ড. দিলারা চৌধুরী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর। বাংলাদেশ অ্যান্ড দি সাউথ …

Leave a Reply