Home | সাক্ষাৎকার | ‘ভাই, দয়া করে সরাসরি দেখাবেন না’

‘ভাই, দয়া করে সরাসরি দেখাবেন না’

১ জুলাই ২০১৬। রমজানের প্রায় শেষ দিকে। আমি আর আমার স্ত্রী একটা সোশ্যাল কলে যাচ্ছিলাম ইফতারের পর। আমরা ইফতারের পর কিছুটা রেস্ট করে বাসা থেকে বের হয়েছি। সময়টা তখন আনুমানিক পৌনে ৮টার মতো হবে। আমাদের প্ল্যান ছিল ধানম-ি যাওয়ার। বাসা থেকে বেরিয়ে আমি যখন কাকরাইল চিফ জাস্টিস সাহেবের বাসার ওখানে, তখন আমাকে র‌্যাবের এক ঊর্ধ্বতন সহকর্মী অতিরিক্ত ডিআইজি লুৎফুল কবির ফোন করল। সে বলল, স্যার, গুলশানে একটা হোটেল দখল করেছে টেরোরিস্টরা। আমি বললাম, তোমাকে কে বলল এটা? তিনি জানান, পশ্চিমা একটি দেশের অ্যাম্বাসি থেকে তাকে এখনই ফোন করে বলেছে। তার সঙ্গে প্রিভিয়াস পোস্টিংয়ের কারণে অনেক অ্যাম্বাসির যোগাযোগ ছিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার ড্রাইভারকে বললাম, গাড়ি ঘোরাও।

আই ওয়েন্ট ব্যাক হোম। মুহূর্তের মধ্যে আমি ইউনিফরম পরলাম। আমার সঙ্গে আমার সিকিউরিটি ডিটেইল ছিল না। আমি দেখলাম, সিকিউরিটির সবাইকে ডাকলে সময় লাগবে, আধা ঘণ্টা বসে থাকতে হবে। আমি ওদের ফোন করে বললাম, আমি গুলশান যাচ্ছি, তোমরা রেডি হয়ে চলে আসো। আমি উইদাউট অ্যানি সিকিউরিটি শুধু ড্রাইভার আর বডিগার্ড নিয়ে রওনা দিলাম গুলশানের দিকে। আমার গাড়িতে সব সময় ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সিকিউরিটি গিয়ারগুলো থাকে। সেসব নিয়েই আমি রওনা দিলাম।

গাড়িতে বসে প্রথমেই আমি ফোন করলাম আমার এডিজিকে (অপারেশন)। বললাম, তুমি গুলশানের ঘটনা জানো? বলল, না, জানি না স্যার। ঘটনা জানিয়ে তাকে তৎক্ষণাৎ গুলশানে আসতে বললাম। তার পর ফোন করলাম র‌্যাব-১-এর কমান্ডিং অফিসারকে। সে-ও ঘটনাটা জানত না। তাকে তাৎক্ষণিকভাবে র‌্যাবের যত প্যাট্রল (টহল টিম) আছে আশপাশে, সবাইকে ওখানে পাঠাতে বললাম। আরও বললাম তুমি অ্যাডিশনাল টু হান্ড্রেড ট্রুপস নিয়ে ২০ মিনিটের মধ্যে ওখানে হাজির হবে। এর পর ফোন করলাম ডিরেক্টর অপারেশনকে। গাড়িতে বসেই ঘটনাস্থলে যেতে যেতে আমি ফোনগুলো করছিলাম। ওকেও বললাম যে, তুমি গুলশানের ঘটনা জানো? সে-ও বলল, না, আমি জানি না। তিনি তখন কোথাও একটা ইফতার পার্টিতে ছিলেন। আমি বললাম এক্ষুণি গুলশানে আসো। এর পর আমি ফোন করলাম আমার ডিরেক্টর ইন্টেলিজেন্সকে। সে-ও ইফতার পার্টিতে ছিল। ও বলল, স্যার, আমি একটা ইফতার পার্টিতে, ক্যান্টনমেন্টে। আমার ১০ মিনিট লাগবে।

এর পর আমি উচ্চপর্যায়ে জানানোর জন্য ফোনটা হাতে করে চিন্তা করলাম, আমাকে যে ইনফরমেশনটা দেওয়া হলো, আমি তো সেটা ভেরিফাই করলাম না। এ ধরনের একটা তথ্য সম্পর্কে সর্বাংশে নিশ্চিত না হয়ে উচ্চপর্যায়ে জানানো কি ঠিক হবে? এটা চিন্তা করার পর পরই আমি ফোন করলাম ডিসি গুলশানকে। দেখি, কন্টিনিউয়াসলি ওর ফোন ব্যস্ত। ফোন করলাম এডিসি গুলশানকে। ওর ফোনও ব্যস্ত। দেন আই কলড এসি গুলশান। সে ফোনটা ধরল। আমি বললাম, কোনো টেরোরিস্ট ইনসিডেন্ট আছে নাকি? সে বলল, জ্বি স্যার। জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায় ঘটনা। তিনি বললেন, রোড নম্বর ৭৯-এর শেষ মাথায়। রেস্টুরেন্টের নাম হলি আর্টিজান। তখন আমি বুঝলাম, ইটস নট আ হোটেল, ইটস আ রেস্টুরেন্ট। কনফার্ম হলাম আমি। তখন আমি শীর্ষপর্যায়ে জানালাম যে, এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অ্যান্ড আই অ্যাম অন ওয়ে টু দ্য স্পট।

আমি নিকেতনের কাছে পৌঁছে গিয়ে দেখি, ওখানে যে পুলিশের চেকপোস্ট থাকে, ওরা দুটি রাস্তাই বন্ধ করে রেখেছে। আমি তখন গাড়ি থেকে নেমে গেলাম। আমি ওদের বললাম, তোমরা দুটি রাস্তাই বন্ধ করে রেখেছ কেন? ইউ মাস্ট অ্যালাও দিজ ভেহিকেল গেটিং আউট ফ্রম গুলশান। কারণ গুলশান খালি করতে হবে। গুলশান থেকে যে গাড়িগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোকে তোমাদের অ্যালাও করতে হবে। গুলশানে গাড়ি ঢুকতে দিবে না, তবে যেগুলো বেরোচ্ছে সেগুলোকে বেরোতে দাও। আমার সঙ্গে যারা ছিল, বডিগার্ড, ড্রাইভার ও চেকপোস্টের সদস্যদের নিয়ে রাস্তা খুলে দিলাম। খুলে দিয়ে আমি জরুরি অবস্থাদৃষ্টে উল্টা পথ দিয়ে ঘটনাস্থলে গেলাম। একেবারে ৭৯ নম্বর সড়কের চৌরাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালাম। যেতে যেতে ডিএমপির ট্রাফিক চ্যানেলে গিয়ে ট্রাফিক কন্ট্রোলকে অনুরূপ আদেশ দিলাম, হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টসংলগ্ন রাস্তার চারপাশে ব্যারিকেড বসানোর নির্দেশ দিলাম।

আমার মনে হয় ৯টা ২০ বা ২৫ বাজে তখন। আমি গিয়ে দেখলাম, অনেক লোকজন ঘটনাস্থলে আসছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমি প্রকৃত ঘটনাটা জানার চেষ্টা করলাম। এর মধ্যে আমার ডিরেক্টর ইন্টেলিজেন্স (ঘটনাস্থলে) পৌঁছে গেছে। ডিজিএফআই, এনএসআইয়ের কিছু অফিসার পৌঁছে গেছে। গুলশান থানার কিছু অফিসার ছিল। এদের কাছ থেকে আমি প্রাথমিক ব্রিফিং নিচ্ছিলাম। ওরা আমাকে বলল, স্যার, কয়েকজন ছেলে ঢুকছে, ভেতরে ঢোকার পর গুলি করেছে। প্যাট্রল পুলিশ ঘটনাস্থলের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাদের ওপর গুলি ও একাধিক বোমা নিক্ষেপ করেছে। ওখানে প্রচুর লোক জিম্মি আছে। ওখানে কিছু বিদেশি আছে। জিজ্ঞাসা করলাম কত? কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে ফিগার কেউ বলতে পারছিল না। তখন দ্রুত আমি একটি রেকি টিম গঠন করি এবং জঙ্গিদের গ্রেপ্তার ও জিম্মিদের উদ্ধারের জন্য অপারেশনের লক্ষ্যে তাদের স্বল্প সময়ের মধ্যে রেকি সম্পন্ন করে আমাকে জানাতে বলি।

যারা পালিয়ে আসছিল রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে বা যাদের আমরা তখন উদ্ধার করতে পেরেছিলাম, তারা বলছিল যে, জঙ্গিরা গুলি করেছে কয়েকজনকে, তার পর স্ট্যাব করেছে। কিন্তু আহত-নিহত কতজন হয়েছে উদ্ধারকৃতরা ওই রাতে তখন আমাদের বলতে পারেনি। অনেক পর আমরা বুঝতে পারি, কিছু লোক ওখানে কিলড হয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে জিম্মি উদ্ধার অপারেশনের জন্য কিন্তু স্পেশালাইজড ইকুইপমেন্ট ও লজিস্টিক প্রয়োজন হয়। আমি বর্তমান দায়িত্বের আগে পুলিশ কমিশনার ছিলাম। সরকারের কৃপায় ঢাকা মহানগর পুলিশের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা দীর্ঘতম সময়ের জন্য কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের দুর্লভ সুযোগ আমার হয়েছিল। এই সময়ে আমার পরিকল্পনায় এবং সরকারের সদয় অনুগ্রহ ও সুদৃঢ় সমর্থনে আমি ওই প্রতিষ্ঠানে অনেক অত্যাধুনিক টেকনোলজি, ইকুইপমেন্ট ও লজিস্টিক সংগ্রহ করে সংযোজন করি। তাই ডিএমপির কাছে থাকা ইকুইপমেন্ট ও লজিস্টিকের তালিকা আমার জানা ছিল।

আমি ডিএমপিকে বেতারযোগে এপিসি পাঠানোর জন্য বললাম। ওদের (ডিএমপি) সোয়াট টিম পাঠানোর জন্য বললাম। আরও কিছু প্রয়োজনীয় লজিস্টিক পাঠাতে বললাম। ইমিডিয়েটলি আই এস্টাব্লিসড অ্যা টেম্পোরারি কমান্ড পোস্ট, ওই চৌরাস্তার মোড়ে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট থেকে আনুমানিক ৩০০-৪০০ মিটার দূরে। এ জন্য চেয়ার-টেবিল আর তাঁবু নিয়ে এলাম। এটি নিয়ম। যখন কোথাও কোনো ঘটনা ঘটে তার কাছাকাছি স্থানে একটি টেম্পোরারি কমান্ড পোস্ট স্থাপন করতে হয়। তার পর ডিএমপির কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করে ডিএমপির সদস্যদের দিয়ে ওই এলাকাটি সিকিউরড করলাম। নিরাপত্তার জন্য একটি বহির্বেষ্টনী নির্ধারণ করে পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েনের ব্যবস্থা করি। রেস্টুরেন্টকে ঘিরে আক্রমণের জন্য সম্মুখ পজিশনে র‌্যাব মোতায়েন হয়। দুই লক্ষ্যে সিকিউরড করা হলো। একটা হলো- পাবলিক যেন ওই এলাকায় না ঢোকে বা গাড়িঘোড়া না ঢোকে; আর জঙ্গিরা যেন পালিয়ে যেতে না পারে। পাবলিক ঢুকলে ক্যাজুয়ালটি হতে পারে। আবার গাড়ি ঢুকলে আমাদের অপারেশনে অসুবিধা হবে। আর জঙ্গিরা যেন না পালাতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে চাইছিলাম।

ওখানে রেস্টুরেন্টের পাশে একটি লেক আছে। লেকের পাড় দিয়ে রাস্তা আছে। সো অ্যানিটাইম দে (জঙ্গিরা) ক্যান ক্রস দ্য ব্যারিয়ার অর ফেঞ্চ অব দ্য রেস্টুরেন্ট। ওই পাশে গেলে তারা (জঙ্গিরা) পালিয়ে যেতে পারে। আমরা ওই ওয়াকওয়েটি রেস্টুরেন্টের দুপাশ থেকে বন্ধ করলাম। রেস্টুরেন্টটির ঠিক পেছনের ওয়াকওয়ের অংশটি জঙ্গিদের ফায়ার রেঞ্জের মধ্যে। তাই অনুমান ২৫-৩০ মিটার ফাঁকা থেকে গেল। সেখানে পর্যাপ্ত আলো ছিল না। একপর্যায়ে প্রতীয়মান হলো যে, কেউ যদি ক্রল করে ওই ফাঁকা অংশ দিয়ে ওপাশে গিয়ে পানির মধ্যে পড়ে, তাহলে সাঁতরিয়ে লেকের অপর পাড় দিয়ে পালিয়ে যেতে পারবে। সঙ্গে সঙ্গে আমি ডিএমপিকে নির্দেশনা দিলাম, তোমাদের কিছু লোক লেকের ওপারে রাখো। লেকের অপর পাড়কেও আমরা সিকিউরড করলাম। তার পর বাকি থাকল লেক। আমাদের এদিকে যারা ছিল, তারা তো রেস্টুরেন্ট বরাবর ওয়াকওয়েতে নেই। ফলে ওখানে দুপাশে পুলিশ থাকলেও রাতের অন্ধকারে জঙ্গিদের লেকে ঝাঁপ দেওয়ার সুযোগ থেকেই গেল। তখন মনে হলো লেকটি ব্লক করতে হবে। এ সময় বাংলাদেশ নেভির এসিএনএসও (অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ অব ন্যাভাল স্টাফ, অপস) রিয়ার অ্যাডমিরাল মকবুল হোসেইন আমাকে ফোন করেন। উনি আমাকে বললেন, ভাই কোনো হেল্প লাগবে নাকি? আমি বললাম, নেভি সোয়াডস দরকার। উনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ব্যবস্থা করছি। উইদিন থার্টি মিনিট নেভি সোয়াডস চলে এলো। জরুরি মুহূর্তে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তার এই অসামান্য ভূমিকার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিয়ে খাটো করতে চাই না।

সোয়াডস দলের কমান্ডারকে আমি প্রয়োজনীয় ব্রিফ করলাম, তাকে যোগাযোগের সুবিধার জন্য আমাদের নেটের একটি বেতারযন্ত্র দেওয়া হলো। এর পর ওরা লেকে অবস্থান নিল। এ সময় কিন্তু গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমাকে জানালেন, রেস্টুরেন্ট সন্নিহিত হসপিটালের ভেতরে কিছু জঙ্গি প্রবেশ করেছে। আমরা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম, এখানে অনেক রোগী, নার্স রয়েছে।

তার পর আমরা যেটা জানার চেষ্টা করলাম, রেস্টুরেন্টের সামনের যে হসপিটালটি (লেকভিউ ক্লিনিক), এর মধ্যে টেরোরিস্ট আছে কিনা? আমরা একটি র‌্যাব অ্যাসল্ট টিম হসপিটালে ঢুকিয়ে দিলাম। তারা অন্ধকারে পেছন দিক দিয়ে হসপিটালে প্রবেশ করে। ভেতরে ঢুকে ওরা দেখল যে, ওখানে কোনো টেরোরিস্ট নেই। রোগী-নার্সরা আছে। অন্যদিকে আমাদের রেকি টিম আক্রমণের জন্য রেকি সম্পন্ন করে ফিরে আসে, তারা আমাকে একটি হাতে আঁকা অপারেশনাল ম্যাপ তৈরি করে দেখায়। মাথায় তখন একটাই চিন্তা, জিম্মিদের নিরাপত্তা, কত দ্রুত পরিস্থিতির অবসান ঘটানো যায় এবং জঙ্গিদের আটক করা। আমরা মোটামুটি মধ্যরাতের পর অ্যাটাকের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। আমরা র‌্যাবের রেগুলার ট্রুপসের সঙ্গে তিনটি স্নাইপার টিম প্রস্তুত করি। প্রত্যেক টিমকে ব্রিফ করি। বাই দিস টাইম আমাদের ট্রুপস আসছে, পোশাক পরছে, পজিশন নিচ্ছে এসব টিভিতে দেখানো হচ্ছিল। আমাকে একজন সহকর্মী বলল যে, স্যার, সব তো টেলিভিশনে দেখাচ্ছে।

শীর্ষ পর্যায় থেকেও এ বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হলো। আমাকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। তখন আমার মনে পড়ল মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলের কথা। ওখানে দুজন ডিআইজি মারা গিয়েছিলেন টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের কারণে। ভেতর থেকে টেরোরিস্টরা টিভিতে দেখে যে দুজন ডিআইজি এসে গাড়ি থেকে নামলেন। তার পর নিকটবর্তী জানালা দিয়ে টেরোরিস্টরা গুলি করে তাদের হত্যা করে। আমি চিন্তা করলাম, সর্বনাশ, এভাবে চলতে থাকলে তো টেরোরিস্টরা আমাদের সব প্রস্তুতি জেনে যাবে। রেস্টুরেন্টে টিভি থাকতে পারে। তা ছাড়া যে কোনো জায়গায় যখন হামলা হয়, তখন ধরে নিতে হবে আশপাশে আরও টেরোরিস্ট আছে। মেবি সেকেন্ডারি অ্যাটাক করতে পারে। টারশিয়ারি অ্যাটাক করতে পারে। মাল্টিপল অ্যাটাক হতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা এ চিন্তাও করছিলাম যে, ঢাকা শহরে যদি মাল্টিপল অ্যাটাক হয় তাহলে হোয়াট উই শুড ডু? দ্যাট প্ল্যানিং অলসো উই হ্যাভ বিন ডুয়িং। এই পর্যায়ে আমি টিভিতে এলাম। কারণ ওরা আমাদের লোকজনকে দেখাচ্ছিল কে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরছে আর কে কোথায় পজিশন নিচ্ছে । এ পর্যায়ে আমি মিডিয়ায় একটা ব্রিফ করলাম।

বললাম, ভাই, দয়া করে সরাসরি দেখাবেন না। সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করুন, এটা অনেকেই দেখছে। আই মেন্ট টেরোরিস্টরাও দেখছে। সব চ্যানেল মোটামুটি বন্ধ (সরাসরি সম্প্রচার) করেছে, চারটি চ্যানেল বাদে। ওই চারটি চ্যানেলকে আমাদের পরে বন্ধ করতে হয়েছে। মিডিয়াকে ব্রিফ করা শেষে আমি গুলশান থানার একজন অফিসারকে ডেকে স্থানীয় ক্যাবল টিভি বন্ধের নির্দেশ দিলাম। একসময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আক্রান্ত এলাকায় মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সার্ভিস বন্ধ করার জন্য বিটিআরসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। আমি পরে জেনেছি যে, আমার ঘটনাস্থলে পৌঁছার কিছু পর ডিএমপি কমিশনার অকুস্থলে হাজির হন। তিনি সরাসরি রেস্টুরেন্টের পাশে অবস্থিত একটি ছয় তলা বিল্ডিংয়ের নিচে অবস্থান নেন। সেখানে আগে থেকেই গুলশান থানা পুলিশ, গুলশান জোনের ডিসি, এসি, র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক, কিছু ফোর্স ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য অবস্থান করছিলেন। কমিশনার তাদের সবাইকে নিয়ে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের মেইন গেটের সামনে উপস্থিত হলে সেখানে একটি আইইডি বিস্ফোরিত হয়। তাৎক্ষণিকভাবে সবাই দ্রুত ওই এলাকা ত্যাগ করে পূর্বোক্ত ছয় তলা বিল্ডিংয়ের নিচের বেজমেন্টে প্রবেশ করেন। এ ঘটনায় র‌্যাব-১-এর অধিনায়কসহ অনেকে আহত হন।

কয়েক মিনিট পর র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মাসুদ মারাত্মক আহত অবস্থায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য বেজমেন্ট থেকে বেরিয়ে রাস্তার ওপর আমাদের দুজন পুলিশ সহকর্মীকে আহত অবস্থায় দেখেন। তিনি অত্যন্ত দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়ে দুজন র‌্যাব সদস্যের সহযোগিতায় একজনকে উদ্ধার করেন। পরে গুলশানের ডিসি ও অপর একজন সোয়াট সদস্য তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে রাস্তায় অপর পাশে থাকা অন্য আরেকজন সহকর্মীকে উদ্ধার করেন। আমাদের ওই দুজন পুলিশ সহকর্মী হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন।

এ পর্যায়ে যৌথভাবে আক্রমণ পরিকল্পনা প্রণয়নের সুবিধার্থে আমি এ সময় আমার আশপাশে থাকা ডিএমপি সোয়াটের কয়েকজন সদস্যকে পাঠিয়ে পূর্বোক্ত বিল্ডিং থেকে কমিশনারকে আমার টেম্পোরারি কমান্ড পোস্টে নিয়ে আসি। আমাদের সমন্বিত আক্রমণ পরিকল্পনা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে ডিএমপি কমিশনার ও ডিএমপি সোয়াট টিমের অন্যতম একজন কমান্ডার এডিসি সানোয়ার হোসেন সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। প্ল্যান তৈরি করে আমরা হসপিটালের দোতলায় র‌্যাবের স্নাইপার টিমকে পজিশন নিতে পাঠাই। ঘটনাস্থল পার্শ্ববর্তী ছয় তলা বিল্ডিংয়ে র‌্যাবের অপর একটি টিম পজিশন নেয়। রাস্তার এপারেও র‌্যাবের একটি দল পজিশন নেয়। আমরা তিন দিক থেকে অ্যাটাক করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় সম্মুখ পজিশন নিই।

আমাদের সরকারের তরফে অ্যাডভাইজ করা হলো আরও কিছু কাজ করার জন্য। সেগুলোর মধ্যে একটা ছিল নেগোশিয়েট করা। আমাদের সিভিল সার্ভিসের এক ব্যাচমেট, তার এক আত্মীয় ভেতরে ছিল। সে আমাকে ফোন করে তার আত্মীয়ের নাম্বারটি দিল। আমি তখন ওই টেলিফোন নাম্বারটি নিলাম।
ফোন নাম্বার নিয়ে আমার যে ব্যাচমেটের আত্মীয় রেস্টুরেন্টের ভেতর ছিল, আমি তার নাম্বারে ফোন করলাম। দেখি ফোনটা রিং হয় কিন্তু কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে কেটে দেয়। কয়েকবার রিং করলাম কিন্তু বারবারই কেটে দিচ্ছে। তখন আমি একটা টেক্সট করলাম যে, ‘দিস ইস ডিজি র‌্যাব, প্লিজ টক টু মি’। টেক্সট করার পর আবার রিং করলাম কিন্তু কেটে দেয়। আবার টেক্সট করলাম। টেক্সট করার পর আবার রিং করলাম।

কিন্তু কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে কেটে দেয়। প্রায় হাফ এন আওয়ারের মতো আমি চেষ্টা করলাম টু কমিউনিকেট উইথ দেম (জঙ্গিদের সঙ্গে)। পরে বুঝলাম যে, ওরা (জঙ্গিরা) আমাদের সঙ্গে রেসপন্স করবে না। এর মধ্যে মেজর জেনারেল (অব.) খালেদ, তৎকালীন বিজেএমসির চেয়ারম্যান, আমরা যে চৌরাস্তায় টেম্পোরারি কমান্ড পোস্ট তৈরি করেছি তার উল্টো পাশে তার বাসা তিনি এসে হাজির। উনি যখন শুনেছেন যে আমি ওখানে আছি, তখন বের হয়ে এসেছেন। এসে বলছিলেন, বেনজীর ভাই, আপনার কোনো হেল্প লাগবে নাকি? পানিটানি লাগবে নাকি? আমি বললাম পানিটানি লাগবে না, আমাকে অন্য একটা সাহায্য করেন। আপনার বাসার ড্রয়িংরুমটাকে আই ওয়ান্ট টু ইউজ অ্যাজ মাই টেম্পোরারি কমান্ড পোস্ট। একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা হিসেবে হ্যাপিলি তিনি সঙ্গে সঙ্গে তার ড্রয়িংরুম তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের ছেড়ে দিলেন। তার এই ঔদার্যের জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে চির কৃতজ্ঞ। তখন থেকে সকালের অপারেশন পর্যন্ত ওখানেই আমাদের কমান্ড পোস্ট ছিল। সেখানে আমরা হোল্ডিং সেন্টার স্থাপন করি। যত লোক রিকভার করছি বা ধরে নিয়ে আসছি সব আমরা ওই বাসায় রেখেছি। তা ছাড়া আইজিপিসহ সব সংস্থার সিনিয়র অফিসাররা সারা রাত সেখানেই যাওয়া-আসার মধ্যে ছিলেন।

এদিকে রাত ১টার দিকে ওই হোটেলের যে সিসি ক্যামেরা আছে, ওটাকে র‌্যাবের সাইবার টিম হ্যাক করতে সক্ষম হয়। সো উই কুড অলসো সি হোয়াট দে (জঙ্গি) আর ডুয়িং ইনসাইড। দোতলার ক্যামেরাগুলোকে আমরা হ্যাক করতে পেরেছিলাম।
মধ্যরাতের দিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি জরুরি সভা আহ্বান করা হয়। আইজিপি, এসবি প্রধান, ডিএমপি কমিশনারসহ আমরা ওখানে গিয়ে দেখলাম সেনাপ্রধানসহ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আছেন। সিদ্ধান্ত হয় যে, মূল অ্যাসল্টটা করবে সেনাবাহিনীর এক নম্বর প্যারা কমান্ডো ইউনিট। আমরা তাদের রেগুলার ও ইমার্জেন্সি ব্যাকআপ দেব। আমরা তো আগে থেকে চারদিক সিকিউর করেই রেখেছি। তার পর ভোররাতে সিলেট থেকে আসা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের অফিসাররা আমাদের এখানে এসে আমার কাছ থেকে ব্রিফ নেয়। আমি তাদের ব্রিফ করি।

এর কিছু আগে সেনাবাহিনীর পরিচালক, মিলিটারি অপারেশন এসে আমাদের কাছে ব্রিফিং গ্রহণ করেন। তারা আমাদের পজিশন দেখেন। সিকিউরিটি কর্ডন কোথায় কী আছে, সব জানানো হয়। ব্রিফ করার পর তারা সবাই একে একে ফিরে যান। ফিরে গিয়ে সেনাবাহিনীর নিজস্ব ব্রিফিং শেষ করে অ্যারাউন্ড সেভেন ও’ক্লক ইন দ্য মর্নিং কমান্ডোরা পূর্ণ আক্রমণ প্রস্তুতি নিয়ে ঘটনাস্থলে আসে। তাদের প্রথম প্ল্যান ছিল, তারা একটা ফাইনাল রেকি করবে। তখন সকাল। রেকি করার জন্য দুজন সিনিয়র কর্মকর্তা সামনে যায়। দিনের আলো ছিল। ভেতর থেকে টেরোরিস্টরা দেখতে পায়। দেখেই ওরা গ্রেনেড ছোড়ে আর গুলি করে। তখন সঙ্গে সঙ্গে অপারেশন শুরু হলো। সেনা কমান্ডোরা এপিসি নিয়ে সরাসরি রেস্টুরেন্টে অ্যাটাক করে। এপিসি দেখে জঙ্গিরা দৌড়ে বেরিয়ে আসতে গেলে র‌্যাবের স্নাইপাররাও গুলি ছুড়তে শুরু করে।

অপারেশন শেষ হওয়ার পর সেনাপ্রধান, আইজিপিসহ বাহিনীপ্রধানরা সবাই ভেতরে প্রবেশ করেন। অপারেশন শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে আমরা ঢুকেছি ভেতরে। ভেতরে গিয়ে আমরা বিদেশিদের ডেডবডি দেখতে পাই। আমরা ভবনের একেবারে ভেতরে ঢুকিনি, কারণ ইট ওয়াজ নট ক্লিয়ার। ভেতরে কোনো ট্র্যাপ কিংবা আইইডি থাকতে পারে। এ জন্য কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে থেকে আমরা দেখি। একদম ভেতরে গিয়ে দেখাটা ওয়াজ নট সেফ। সে কারণে গ্লাসের ডোরগুলো ছিল যেখানে, সেখানে দাঁড়িয়ে গিয়ে যত দূর দেখা যায় তা দেখি। আর পাঁচটি টেরোরিস্টের ডেডবডি পড়েছিল মাঠটিতে, ঠিক লেকভিউ হসপিটালের সামনে।

এ রকম একটা ঘটনা ঘটতে পারে সেটা সব সময় আমাদের চিন্তায় ছিল। কেননা বিশ্বব্যাপী, সেই সঙ্গে আশপাশের দেশগুলোয় এ রকম ঘটনা হচ্ছিল। আমাদের দেশে পাদ্রি, পুরোহিত ও বিদেশিদের হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ইন্ডিভিজুয়ালি। এতে করে আমাদের মধ্যে ধারণা সৃষ্টি হয় যে, দে ক্যান ট্রাই টু ডু সামথিং ইনসাইড ঢাকা সিটি। তাই যখন এ ধরনের ঘটনা ঘটল, তখন পার্সোনালি বলতে পারি, আমি কিন্তু মোটেও হতবিহ্বল হয়নি। আমি জানতাম, আমাকে কী করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে আমরা পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও অন্যদের তুলনায় স্বল্পতম সময়ে জিম্মি পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে সক্ষম হই, যা বিশ্ববাসী প্রশংসার চোখে দেখেছে। এ অপারেশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের সদস্য ও র‌্যাবের সম্মুখ অবস্থানে থাকা সদস্যরা অপরিসীম সাহস, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দেন। নেভি সোয়াডস, পুলিশ, বিজিবিসহ সব গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ও সদস্যরা খুবই প্রশংসনীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখেন, এদের প্রত্যেকের জন্য জাতি গর্ব অনুভব করতে পারে।

জঙ্গিদের রক্তপিপাসার কারণে যেসব নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরে যায়, তাদের জন্য আমাদের শোক ও পরিবারের জন্য অশেষ সমবেদনা।
বিগত এক বছরে আমরা ডজন ডজন জঙ্গি সেলকে বিনষ্ট করেছি। এই জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রধান সারোয়ার জাহান ওরফে মানিক ওরফে ইব্রাহিম আবু আল হানিফ র‌্যাব কর্তৃক গ্রেপ্তারকালে পঞ্চম তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে নিহত হয়েছে।

এদের দাওয়াত শাখা, প্রশিক্ষণ শাখা ও মিডিয়া শাখাকে ভঙ্গুর করা হয়েছে। জঙ্গিদের আর্থিক মেরুদ- দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। র‌্যাব এ পর্যন্ত ৬৭ লাখ টাকা জঙ্গিদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে। অর্থসহায়তাকারী অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছে। জঙ্গিদের নারী শাখার নেতৃবৃন্দকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

যদি ফিরে তাকাই, বিগত ১ জুলাই থেকে অদ্যাবধি শুধু র‌্যাব এককভাবে ১৫৭ জন নেতৃস্থানীয় থেকে বিভিন্ন স্তরের জঙ্গি গ্রেপ্তার করেছে, সাতজন গোলাগুলিতে নিহত হয়েছে। এগুলো শুধু র‌্যাবের পরিসংখ্যান। এর সঙ্গে পুলিশের সাফল্য যোগ করলে এ পরিসংখ্যান আরও স্ফীত হবে। কিন্তু এতে করে আত্মতুষ্টির সামান্যতম কোনো অবকাশ নেই। এরা যে কোনো সময় আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। সে জন্য র‌্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রয়াস চলমান এবং অব্যাহত থাকবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জঙ্গিদের প্রতি ‘শূন্য সহিষ্ণুতার’ নীতি ও নিয়ত নির্দেশনা, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিরবচ্ছিন্ন তত্ত্বাবধান ও অনুপ্রেরণা, সেই সঙ্গে ১৬ কোটি শান্তিপ্রিয় দেশপ্রেমিক মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন আমাদের নিরন্তর শক্তির উৎস। দেশ থেকে জঙ্গিবাদের সর্বশেষ বীজটি উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবেই। ২০১৭ সালের ১ জুলাই এটিই আমাদের সবার প্রতিজ্ঞা।
লেখক: মহাপরিচালক, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

About admin

Check Also

‘সংসদ বহাল রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়’

ড. দিলারা চৌধুরী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর। বাংলাদেশ অ্যান্ড দি সাউথ …

Leave a Reply