Home | বিশেষ প্রতিবেদন | বাঁইচ্যা থাকলে সবকিছু ফাঁস হওয়ার চান্স আছে, তাই ‘বন্দুকযুদ্ধ হতে পারে : তুফান

বাঁইচ্যা থাকলে সবকিছু ফাঁস হওয়ার চান্স আছে, তাই ‘বন্দুকযুদ্ধ হতে পারে : তুফান

লোকে তুফান সরকারকে মন্দ বলছে। বলুক, আমি লোকের কথায় কান দেব না। হিন্দুদের মধ্যে অনেকেই যেমন হনুমানের ভক্ত, আমিও তেমনি তুফানভক্ত।তুফান সরকার কিভাবে আমার ভক্তি-সমীহ-ভালোবাসার পাত্র হলেন, সে কাহিনী অনেক লম্বা। সংক্ষেপে বলছি- ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারী একটি কোম্পানির বিক্রয় কর্মকর্তা হিসেবে বগুড়া শহরে পা রাখার পর দেখলাম, এখানকার সবকিছু তুফানময়।শহরে বেশুমার ইজিবাইক। প্রতিটি ইজিবাইকের গায়ে তুফান সরকারের নাম শোভা পাচ্ছে! এমনটি হওয়ার কথা নয়। শহরের রাস্তায় যানবাহন চলাচলের বৈধতা নির্ধারণের ক্ষমতা পৌরসভার।বগুড়া পৌরসভা এ দায়িত্ব তুফান সরকারের হাতে ন্যস্ত করেছে। এর মানে হল, পৌরসভার চেয়ে তুফান সরকারের ক্ষমতা বেশি! বিষয়টা মাথায় ঢোকার পর এক সেকেন্ডও দেরি হল না, আমার ভক্তিরাজ্যে তুফান সরকারের অভিষেক ঘটল।

প্রকৃতির নিয়মে দিনশেষে রাত হচ্ছে। রাতের পর দিন। চাকরিতে আয়-উন্নতির চেষ্টা করছি- হঠাৎ একটা দুর্ঘটনা ঘটল। কোম্পানির মালবোঝাই একটা ট্রাক বগুড়া শহরে ঢোকার পরপরই গায়েব হয়ে গেল।মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। অনেক টাকার মামলা। চাকরি তো থাকবেই না, জেল-জরিমানা এড়ানোও সম্ভব হবে না। খবর পেয়ে পরিচিত এক ব্যবসায়ী ছুটে এলেন। সবকিছু শোনার পর তিনি পরামর্শ দিলেন-

: আপনে তুফান সরকারের কাছে যান।
আহ্! নামটা কানে যেতেই হৃদয়ে ভক্তিভাব উথলে উঠল। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললাম-

: আমি তুফান সরকারের মস্তবড় ভক্ত।
: তাইলে তো ব্যাপারটা অনেক সহজ হইয়া গেল।

: কিন্তু ওনার সঙ্গে আমার পরিচয় নাই।
: এইটা কোনো সমস্যা না; আসেন আমার সঙ্গে।

ব্যবসায়ী ভদ্রলোক আমাকে শহরের মাঝখানে একটা ভবনের সামনে নিয়ে এলেন। ভবনের গায়ে টাঙানো বিশাল সাইনবোর্ডের দিকে আঙুল তুলে বললেন-
: ওই যে দেখেন, সাইনবোর্ডে তুফান সরকারের ফোন নম্বর দেয়া আছে। আপনে এই নম্বরে ফোন করেন।

মনোযোগসহকারে সাইনবোর্ডের কথাগুলো পড়লাম। সবধরনের রোগ উপশমকারী কোনো ওষুধের বিজ্ঞাপনে যেসব কথা বলা হয়, সাইনবোর্ডেও সে ধরনের কথাবার্তা লেখা রয়েছে। শহরবাসীর যাবতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য তুফান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

ফোনের নম্বর টিপতে গিয়ে টের পেলাম, হাত কাঁপছে। একটু পর এই কাঁপুনি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। তাড়াতাড়ি ফোন পকেটে রেখে দিলাম। ব্যবসায়ী ভদ্রলোক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
: কী হইল! ফোন করলেন না?
: এই টাইমে যদি তিনি বিশ্রামে থাকেন!

: তাতে কী হইছে? এইটা তো তার ব্যবসা। দেরি করলে ওর লোকজন ট্রাকসহ সব মাল বিক্রি কইরা দিবে। তাড়াতাড়ি ফোন করেন।
: একটু পরে করতেছি…
নাগরিকদের সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব যে সরকারের, সরকারদলীয় কর্মী হিসেবে তুফান সরকার তা যথার্থ উপলব্ধি করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে নিষ্ঠা ও কর্তব্যপরায়ণতার অতুলনীয় স্বাক্ষর রেখেছেন।

অভিভূত হলাম এই ভেবে, নিজের কর্তব্য সম্পর্কে তুফান সরকার এতটাই সজাগ ও সচেতন- তিনি সরকারি প্রশাসন বা পুলিশবাহিনীর ভরসায় বসে থেকে অযথা সময় নষ্ট করেননি; নিজের গাঁটের পয়সায় সাইনবোর্ড তৈরি করে সেবা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন।

এরকম একজন মহৎপ্রাণ মানুষকে যদি আমি সমীহ না করি, তবে কাকে করব? অতএব আমার ভক্তিরাজ্যের তুফান অঙ্গে আরও একটি পালক যোগ হল। এর নাম সমীহ। অনেক সাহস সঞ্চয় করে, অন্তরে-বাহিরে সমীহ ভাব বজায় রেখে তুফান সরকারের নম্বরে ফোন করলাম। ওপাশ থেকে ভারি গলায় জানতে চাওয়া হল-
: কী সমস্যা?
: বেয়াদবি মাফ করবেন। সমস্যার কথা ফোনে বলতে চাই না।
: কেন?
: এতে আপনার মতো একজন মহান ব্যক্তিকে অপমান করা হবে। আমি সশরীরে আপনের দরবারে হাজির হইয়া আপনের পদতলে বইসা সমস্যার কথা জানাইতে চাই।

সাক্ষাতের অনুমতি মিলল। রাতে স্নিগ্ধ আলোর তুফান-দরবারে হাজির হলাম। অর্থদণ্ডের বিষয়টি মাথায় ছিল, কিন্তু তার পরিমাণ এত বেশি হবে ভাবিনি। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললাম-
: ঘরে আমার বৃদ্ধ বাবা-মা আছেন। বউ-বাচ্চা আছে। দয়া কইরা আপনে আমারে জেলে পাঠানোর বন্দোবস্ত করবেন না।

কান্নার ফল পাওয়া গেল। অর্থদণ্ড অনেকখানি লাঘব হল। তারপরও দেখলাম, দাবিকৃত টাকা আমার পক্ষে একসঙ্গে পরিশোধ করা অসম্ভব। হাতজোড় করে মিনতি জানিয়ে বললাম-
: আরেকটু দয়া করেন। তা না হইলে সবাইকে না খাইয়া মরতে হবে।

তুফান সরকার দয়ার ধরন সম্পর্কে জানতে চাইলেন। বললাম-

: এনজিওরা যেমন কিস্তি ফর্মুলায় টাকা আদায় করে, আপনেও আমারে সেইরকম কয়েকটা কিস্তি কইরা দেন। প্রতিমাসে বেতন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি আইসা কিস্তি পরিশোধ কইরা যাব।
কিস্তির আবেদন মঞ্জুর হতো কিনা জানি না, এ সময় দেখলাম- তুফান সরকারের লোকজন ব্যাগভর্তি টাকা নিয়ে দরবার কক্ষে প্রবেশ করছে।

আগের দিনের রাজা-বাদশারা যেভাবে হাতের ইশারায় কাউকে দরবার ত্যাগের আদেশ দিতেন, তুফান সরকার আমার দিকে তাকিয়ে সেরকম ভঙ্গিতে ইশারা করলেন।

সাগরেদরা তৈরিই ছিল। তারা আমাকে বের হওয়ার রাস্তা দেখিয়ে দিল। এরপর যতই দিন গেছে, সময়কে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তুফান সরকারের দক্ষতা, কর্মনৈপুণ্য ও প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আলেয়া যেমন বাংলাকে ভালোবাসতে গিয়ে বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে ভালোবেসে ফেলেছিল, আমিও তেমনি তুফান সরকারের দক্ষতা, কর্মনৈপুণ্য ও প্রতিভাকে ভালোবাসতে গিয়ে তাকে ভালোবেসে ফেলেছি।

দিনে দিনে তুফান সরকারকে ঘিরে আমার ভক্তি-সমীহ-ভালোবাসার পাত্র কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠছিল, হঠাৎ দুঃসংবাদ পেলাম। খবর শুনে হৃদয় মোচড় দিয়ে উঠল- তুফান সরকারকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। পুলিশ তুফান সরকারের ব্যাপারে এতদিন কানা ছিল, বেশ ছিল। হঠাৎ কী কারণে তারা চোখ খুলল, বুঝতে পারছি না। আর মাত্র একটা কিস্তি বাকি। এটা শোধ হলেই তুফান সরকারের ঋণ থেকে মুক্তি পাব। কথায় আছে- আগুন, শত্রু ও ঋণের শেষ রাখতে নেই। ঠিক করলাম, তুফান সরকারের পাওনা টাকা তার হাতে তুলে দেব।

বেতনের টাকা হাতে পেয়েই ফুলের দোকানে গেলাম। আমি তুফান সরকারের একজন ভক্ত ও প্রেমী। ফুল না নিয়ে তার সামনে যাওয়া ঠিক হবে না। ফুলের তোড়া পছন্দ করছি- চারপাশ থেকে নানা ধরনের কথাবার্তা কানে আসছে। সবাই তুফান সরকারের সমালোচনা করছে; তার বিত্ত-বৈভবের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এমএ পাস লোক হয়েও আমি আমার বিত্তবাসনা পূরণ করতে পারিনি।

তুফান সরকার বলতে গেলে ব-কলম। অথচ তার ডাবল বাড়ি, ডাবল গাড়ি- সবকিছুই ডাবল ডাবল। এত সব অর্জন যে মানুষটির, অন্যরা তাকে যত খুশি ছোট করুক, আমি করব না। আমি তাকে ফুল দিয়ে অভিষিক্ত করব।

জেলগেটে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর তুফান সরকারের দেখা পেলাম। মরা হাসি দিয়ে বললাম-
: আমারে চিনতে পারছেন? আমি আইয়ূব আলী।
তুফান সরকার আমাকে চিনতে পারছেন না দেখে আরেকটু গভীরে গেলাম। বললাম-
: ওই যে ট্রাক লোপাটের মামলা…
তুফান সরকার ঠোঁট ফাঁক করে মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলেন। সফল হলেন না। মাথা নেড়ে অনুচ্চ স্বরে বললেন-
: এইবার চিনতে পারছি। আপনের কেইস অনেক আগেই শেষ হইয়া গেছে না?
: হ।
: তাইলে আমার কাছে আসছেন কী জন্য?
: আমার একটা কিস্তি বাকি ছিল, সেইটা দিতে আসছি। সঙ্গে শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে এই ফুলের তোড়াটা আনছি।
তুফান সরকার টাকা, ফুল কোনোটাই নিলেন না। বললেন-
: জেলখানায় আমি ফুল দিয়া কী করব! জেলে ফুলের কদর নাই; কদর আছে বিড়ি-গাঞ্জা-ইয়াবা-হেরোইন-ফেনসিডিলের। যদি জীবন লইয়া এইখান থেইকা বাইর হইতে পারি, যদি সমাজে আবার পুনর্বাসন ঘটে, তখন ফুলের প্রয়োজন পড়বে।
তুফান সরকারের সংশয় তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলাম। বললাম-

: যদি মানে কী? সামনে ইলেকশন। ভোটের রাজনীতিতে আপনার মতো বাহিনী প্রধানদের ব্যাপক কদর। সময়মতো আপনে ঠিকই লাইনে উইঠ্যা যাবেন।

তুফান সরকারের ভাবলেশহীন চাহনি বলে দিচ্ছে, আমার কথায় তিনি আস্থা রাখতে পারছেন না। তার এ আস্থাহীনতার কারণ কী? ভাবতে গিয়ে মনে হল, দিনাজপুরের ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তৎকালীন বিএনপি শাসকগোষ্ঠী যে ভূমিকা গ্রহণ করেছিল, বগুড়ার ধর্ষণ ঘটনার ক্ষেত্রে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী সে ভুল করেনি।

তারা শুধু তুফান সরকার নয়, তার ভাই মতিন সরকারকেও দল থেকে বহিষ্কার করে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বিষয়টি বুঝতে পেরেই কি তিনি এমন বিষণœ হয়ে গেছেন? মানুষের মন ভালো করার অন্যতম টনিক টাকা। টাকার কথা বলে তুফান সরকারের মন ভালো করার উদ্যোগ নিলাম। বললাম-
: ঠিক আছে, ফুল না নিলেন; আপনের পাওনা টাকাগুলা নেন।
: আর টাকা! এমনও হইতে পারে, দেখা যাবে- দু’দিন পরে আমার সব টাকা-পয়সা ইন্দুরে কাটতেছে! টাকা দিয়া আমি কী করব? আপনে বরং এক কাজ করেন, আমার পক্ষ থেইকা টাকাগুলা মসজিদ-মাদ্রাসা বা কোনো এতিমখানায় দান কইরা দেন।
অবাক কাণ্ড! টাকার প্রতি তুফান সরকারের মোহ নেই, এর মানে কী? পুলিশ মারতে মারতে তাকে জগৎ-সংসারের প্রতি উদাসীন করে ফেলেছে নাকি? লোকে বলে, হাতি কাদায় পড়লে চামচিকাও উষ্টা মারে। এতদিন তুফান সরকারকে ভাই ডাকার সাহস পাইনি। এখন যেহেতে অবস্থান খানিকটা দুর্বল, ভাই সম্বোধন করে বললাম-
: ভাই, পুলিশ কি থেরাপি দিতে দিতে আপনেরে বাউলা বানাইয়া ফেলছে!
: আরে না; পুলিশ আমারে কাবু করতে পারে নাই!
: তাইলে?
: গত রাইতে আমি একটা ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখছি।
: কী স্বপ্ন?
: দেখলাম, আমি আমার নিজের লাশ কান্ধে লইয়া হাঁটতেছি।
: আপনে কি মরণের ভয় করতেছেন?
: অসম্ভব কিছু না। বাহিনী গঠন কইরা যে টাকা কামাইছি, তা আমি একলা ভোগ করি নাই। টাকার ভাগ ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল পর্যন্ত গেছে। ভাগীদাররা যদি মনে করে, আমি বাঁইচ্যা থাকলে সবকিছু ফাঁস হওয়ার চান্স আছে, তাইলে আমার জীবন-নাটকের পাণ্ডুলিপিতে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ অবতারণা অনিবার্য হইয়া উঠতে পারে। তাছাড়া একই উদ্দেশ্যে আমার ভাইও আগাইয়া আসতে পারে।
: আশ্চর্য হইলাম!
: আশ্চর্য হওয়ার কিছু নাই। আমার কারণে তার সাম্রাজ্যে ধস নামছে। দল থেইকা বহিষ্কৃত হইছে। ভাই হইলেই কী, আর চাচা হইলেই কী! এই ক্ষতি কেউ মানতে চাইবে না। আমার রক্ত দিয়া যদি তার পাপমোচন ঘটে, সে তাই করবে।
: কিন্তু ভাই হইয়া ভাইয়েরে…
তুফান সরকারের দৃষ্টি প্রসারিত হল। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন-
: বগুড়া শহরে আমি বছরব্যাপী বাণিজ্য মেলার আয়োজন করছিলাম। সেইখানে একবার শাহজাহান নাটক মঞ্চস্থ হইছিল। সেই নাটকে বাদশাহ আওরঙ্গজেবের মুখে একটা সংলাপ ছিল এইরকম-
: পিতাকে বন্দি করেছি, ভাইকে হত্যা করেছি- এসব করেছি কেবল ক্ষমতার জন্য। শুধু ক্ষমতার জন্য…
সংলাপ বলতে বলতে তুফান সরকার ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তুফান সরকারের কণ্ঠে সম্রাট আওরঙ্গজেবের সংলাপ, চোখে অশ্রুর বন্যা-
: আহা রে তুফান সরকার। কান্দে জারেজার॥
এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমার কী করা উচিত, ঠিক করতে পারছি না।

মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক
যুগান্তর

About admin

Check Also

সৌদিতে স্ত্রী তালাকের ভুয়া নিউজ সরিয়ে নিল আন্তর্জাতিক মিডিয়া

মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা গাল্ফ নিউজের বরাত দিয়ে ভারতের জাতীয় পত্রিকাগুলো একটি মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে …

Leave a Reply