Home | ক্যাম্পাস | র‌্যাগিং না নির্যাতন?

র‌্যাগিং না নির্যাতন?

পরিচিত হওয়ার কথা বলে ৫ মে রাত ১০টায় প্রথম বর্ষের ৪০ জনকে নিয়ে যাওয়া হয় হলের ছাদে। সেখানে ভোর ৫টা পর্যন্ত তাঁদের ওপর চালানো হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
নির্যাতন সইতে না পেরে ওই রাতে একজন অচেতন হয়ে পড়েন। পরে নির্যাতনকারীরাই তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যান। সেখান থেকে তাঁকে নেওয়া হয় আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
ঘটনাটি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের। নির্যাতনের শিকার ছাত্ররা কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। নির্যাতনকারীরও একই বিভাগের অন্য বর্ষের শিক্ষার্থী।

পরদিন দুপুরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান র‌্যাগিংয়ের শিকার ওই শিক্ষার্থী। এরপর ড. এম এ রশীদ হলে দুপুরের খাবার খান তিনি। তিনি এ হলেই সংযুক্ত। খাবার শেষে একই হলের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রসহ কয়েকজন ‘বড় ভাই’ তাঁকেসহ বিভিন্ন বিভাগের প্রথম বর্ষের ১৬ জনকে ডেকে নেন টিভি রুমে। এরপর সেখানে তাঁদের বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয়। কিছুক্ষণ পর ওই ছাত্রকে আলাদা করে ডেকে নেওয়া হয় হলের একটি কক্ষে। সেখানেও তাঁকে নির্যাতন করা হয়।
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. শেখ সাদী বলেন, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটি নিয়ে বিভাগের অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের যে শিক্ষার্থীর মাধ্যমে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ওই বিভাগের বিভাগীয় প্রধানকে জানানো হয়েছে বলে জানান শেখ সাদী।

র‌্যাগিংয়ের শিকার ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার কথা হলে তিনি নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষায় অনেক ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ার সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু এখানে র‌্যাগিংয়ের উৎপাত নেই জেনেই ভর্তি হওয়া। কিন্তু প্রতিনিয়ত যেভাবে র‌্যাগিংয়ের নামে নির্যাতনের শিকার হচ্ছি, তাতে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছি।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রথম বর্ষের প্রায় সব ছাত্রই কমবেশি তাঁর বিভাগ বা হল বা মেসের বড় ভাইদের মাধ্যমে র‌্যাগিংয়ের নামে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। প্রথম বর্ষের যাঁরা মেসে থাকেন তাঁদের বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের ‘অস্থায়ী নিবাস’ নামে ছাত্রাবাসের বড় ভাইদের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হন।
প্রথম বর্ষের যাঁদের সঙ্গে এই প্রতিনিধির কথা হয়েছে, তাঁরা কেউই আবার র‌্যাগিংয়ের শিকার হওয়ার ভয়ে নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ক্লাস শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর এক বড় ভাইকে সালাম না দেওয়ায় তাঁকে অস্থায়ী নিবাস ছাত্রাবাসে নিয়ে রাতভর নির্যাতন করা হয়। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দুজন শিক্ষার্থী বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে ফুল দিয়ে ফেরার সময় কয়েকজন বড় ভাই তাঁদের একই ছাত্রাবাসে নিয়ে রাতভর নির্যাতন করেন।

নির্যাতনের শিকার আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, প্রথমে বড় ভাইয়েরা আলাদা করে ডেকে নেন। তারপর একটি ঘরে আটকে রেখে ক্রিকেট স্ট্যাম্প বা রড দিয়ে পেটান। কোনো কোনো সময় চড়-থাপ্পড়ও মারেন। চেয়ারহীন চেয়ারে বসার মতো করে বসিয়ে দুই হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে ওই হাতে স্ট্যাম্প বা বই ধরিয়ে দেওয়া হয়। আবার দেয়ালের সঙ্গে উঁচু করে পা আটকে এক হাতের ওপর শরীরের ভর রেখে অন্য হাতে বই বা স্ট্যাম্প ধরিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে রাখা হয় অনেকক্ষণ। বই বা স্ট্যাম্প হাত থেকে পড়ে গেলে মারা হয় চড়-থাপ্পড়। তা ছাড়া অতিরিক্ত বুকডন দেওয়া, জামাকাপড় খুলে ফেলা, নাচ-গান করানো ও বিভিন্ন গালিগালাজ তো রয়েছেই।
উপাচার্য মুহাম্মদ আলমগীরের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিংয়ের ঘটনা এখন নেই বললেই চলে। কিছু ঘটলে সেটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

About admin

Check Also

সভায় যোগ দিতে দেরি,ছাত্রলীগ নেতার থাপ্পড়ে কানের পর্দা ফাটল এক শিক্ষার্থীর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মারধরে নাঈম ইসলাম নামের এক সাধারণ শিক্ষার্থীর …

Leave a Reply